স্মরণে জিয়াঃ স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র সুরক্ষায় তাঁর অবদান

ইনাম আহমদ চৌধুরী | তারিখ: ৩০-০৫-২০১৩

ভাবতে অবাক লাগে বৈকি, তিরোধানের তিন দশকের অধিক কাল পরেও শহীদ জিয়া ও তাঁর আদর্শ দেশপ্রেম এবং গণতন্ত্র সুরক্ষার ক্ষেত্রে কী আশ্চর্য বলশালী ও উদ্দীপক ভূমিকা পালন করছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের যে গৌরবোজ্জ্বল চেতনা নিয়ে বাংলাদেশের জন্ম, তাকে সংরক্ষণ ও শক্তিমান করে তোলার জন্য সর্বাধিক প্রয়োজন ছিল বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের শক্ত ভিত্তি রচনা—প্রয়োজন ছিল দেশ গঠনের কাজে জনগণের সার্বিক সম্পৃক্ততাবোধের সঞ্চার—প্রয়োজন ছিল নতজানু না হয়ে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ ও সীমান্তে সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রেখে বিশ্বমঞ্চে মাথা উঁচু করে সৌভ্রাতৃত্বের হস্ত প্রসারণ। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তা শুধু যে অনুধাবন ও সংজ্ঞায়িত করেছিলেন তা নয়, সে লক্ষ্যগুলো প্রতিষ্ঠা ও অর্জনের মানসে তাঁর ছিল আমৃত্যু প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা। তাই তো তিনি আজও সকৃতজ্ঞ দেশবাসীর সশ্রদ্ধ স্মরণে।

ব্রিটেনের বিশ্বখ্যাত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ‘আয়রন লেডি’ নামে খ্যাত ব্যারোনেস মার্গারেট থ্যাচার তাঁর মৃত্যুর আগে অনুরোধ রেখে গিয়েছিলেন যেন তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় স্কটল্যান্ডের দেশপ্রেমিক কবি রবার্ট বার্নসের একটি গান গীত হয়। সেটি ছিল, ‘আই প্লেজ টু দ্য, মাই কান্ট্রি’। অর্থাৎ ‘হে আমার দেশ, আমি তোমার কাছে অঙ্গীকারবদ্ধ হলাম’। থ্যাচার বিতর্কিত, কিন্তু তাঁর নিখাদ দেশপ্রেম সম্পর্কে দ্বিমতের অবকাশ নেই। বাংলাদেশের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেশ ও জাতির কাছে সেভাবেই অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছিলেন, তাঁর প্রিয় গান ছিল, ‘প্রথম বাংলাদেশ, আমার শেষ বাংলাদেশ/জীবন বাংলাদেশ, আমার মরণ বাংলাদেশ’। এ গানটি তাঁকে উদ্বুদ্ধ করত। তাঁর সঙ্গে সঙ্গে যেন সমগ্র জাতিও এতে উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশের সেবায় এগিয়ে আসতে অনুপ্রাণিত হয়েছিল। তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর পছন্দের এই গভীর দেশপ্রেমের গানটি মনে পড়ে। ইচ্ছা করে জাতির বর্তমান পরম অস্বস্তিকর মুহূর্তে সবাই এককণ্ঠ হয়ে এ গানটিই গাই।

বিশ্বের সফল ও বরেণ্য রাষ্ট্রনায়ক অনেকেই রয়েছেন। কিন্তু স্বল্প সময়ের মধ্যে সদ্য স্বাধীন হওয়া একটি দরিদ্র ও অনগ্রসর দেশ; যা রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় দোদুল্যমান, তাতে স্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে একটি গণতান্ত্রিক কাঠামোতে তাকে স্থাপন করে, দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদের ভিত্তি সুদৃঢ় করে, উন্নয়নের রাজপথে তাকে চলমান করিয়ে দেওয়ার কৃতিত্ব শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়া ছাড়া বিশ্বের ইতিহাসে খুব বেশি কারও আছে বলে আমার জানা নেই। 

বিস্ময়ের কথা, রাজনীতিতে সে সময় অনভিজ্ঞ এক তরুণ সামরিক কর্মকর্তা কী অদম্য সাহস, অপরাজেয় মনোবল ও অসীম দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে ইতিহাসের এক ক্রান্তিলগ্নে জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে দেন দিকনির্দেশনামূলক স্বাধীনতার ঘোষণা। আবার সফল মুক্তিসংগ্রাম উত্তরকালে মধ্য-সত্তরের চরম বিয়োগান্ত পটভূমে এক অস্থির সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে কান্ডারি হয়ে জাতিকে এক বিপর্যয়ের মুখ থেকে রক্ষা করে তাকে সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর স্থাপন করেন। জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বের প্রথম দিকে ১৯৭৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর ভারতের তদানীন্তন রাষ্ট্রপতি সঞ্জীব রেড্ডি দিল্লিতে অনুষ্ঠিত এক রাষ্ট্রীয় ভোজসভায় রাষ্ট্রপতি জিয়ার কৃতিত্ব ও সম্ভাবনার উচ্ছ্বসিত প্রশংসাবাণী উচ্চারণ করতে গিয়ে একটি ঐতিহাসিক সত্য তুলে ধরেন। জিয়াকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ‘Your position is already assured in the annals of the history of your country as a brave freedom fighter who was the first to declare the independence of Bangladesh.’ অর্থাৎ ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা প্রথম দিয়ে তিনি যেভাবে সাহসী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ভূমিকা পালন করেছেন, তাতে বাংলাদেশের ইতিহাসে তাঁর নাম চির সংরক্ষিত থাকবে।’ রাষ্ট্রপতি জিয়ার শাহাদাতের পর ১৯৮১ সালের জুনের প্রথম সপ্তাহে কমনওয়েলথ সেক্রেটারিয়েট আয়োজিত এক সভায় তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে কমনওয়েলথের তদানীন্তন মহাসচিব স্যার সিদ্ধার্থ রামফাল বলেছিলেন, ‘রাষ্ট্রপতি জিয়া বাংলাদেশে শুধু একদলীয় রাজনীতির পরিবর্তে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাই প্রতিষ্ঠা করেননি; এ উন্নয়নকর্মী দেশকে সার্বিক উন্নয়নের রাজপথে পরিচালিত করেছিলেন।’ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে ‘সার্ক’-এর মাধ্যমে ঐক্যের বন্ধনে গ্রথিত করা ছিল তাঁর এক স্বপ্ন। রাষ্ট্রপতি জিয়ার অকালমৃত্যুতে তাঁর দেশ একজন দক্ষ, সৎ সংগঠক ও সফল রাষ্ট্রনায়ককেই শুধু হারাল না, দক্ষিণ এশিয়া হারাল এক দূরদর্শী স্বাপ্নিক অগ্রপথিককে, উন্নয়নশীল দেশ-গোষ্ঠী হারাল এক সৃষ্টিধর্মী নেতা, কমনওয়েলথ হারাল সৌভ্রাতৃত্ব ও সহযোগিতায় বিশ্বাসী এক মহান ব্যক্তিত্বকে। মার্লবরো হাউসে অনুষ্ঠিত এ সভায় সেক্রেটারি জেনারেল সিদ্ধার্থ রামফালের জলদগম্ভীর কণ্ঠে প্রদত্ত শোকবাণী কী শ্রদ্ধা, কী সম্ভ্রম, কী দুঃখবোধ নিয়ে সমবেত কমনওয়েলথ প্রতিনিধিরা শুনেছিলেন। শোকাহত সে মুহূর্তে উপস্থিত আমারও মহা গর্ববোধ হয়েছিল, আমার দেশের প্রয়াত নেতার প্রতি বিশ্ববাসীর শ্রদ্ধাঞ্জলি দেখে। 

এ প্রসঙ্গে আরেকটি ঘটনা মনে পড়ে। জেদ্দায় ৫৫ সদস্য রাষ্ট্র সমন্বিত ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট থাকাকালে কর্তব্য ব্যপদেশে গিয়েছিলাম সদস্যরাষ্ট্র মালির রাজধানী বামাকোতে। দেশটির তদানীন্তন প্রেসিডেন্ট কোনারে কথায় কথায় বলেন, ‘আপনি তো বাংলাদেশি। বাংলাদেশের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে আমরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি। উন্নয়নকামী দেশগুলোর অগ্রগতির জন্য তাঁর ছিল উল্লেখযোগ্য ভূমিকা। আল-কুদসের আহ্বায়ক হিসেবে তিনি ফিলিস্তিন সমস্যা সমাধানে করেছিলেন আন্তরিক প্রচেষ্টা। তাঁর তিরোধানে ওআইসি ও এলডিসি দেশগুলোর অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। তারা হারিয়েছে এক অন্যতম যোগ্য নেতা।’ অবাক বিস্ময়ে শুনছিলাম এক প্রয়াত রাষ্ট্রপতির প্রতি আরেক দেশের ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের শোকাপ্লুত শ্রদ্ধা নিবেদন, বহু বছরের ব্যবধানে বহুদূরের এক দেশে। প্রেসিডেন্ট কোনারে আরও বললেন, ‘জিয়াউর রহমান স্মরণে আমরা রাজধানীর একটি প্রধান সড়কের নাম করেছি। গিয়ে দেখে আসুন।’ দেখলাম, শহরের প্রশস্ততম রাজপথ কিং ফাহাদ সরণির অব্যবহিত পরেই অ্যাভিনিউ জিয়াউর রহমান। দুই দিকে বৃক্ষসারির মধ্যে প্রসারিত দীর্ঘ রাজপথ। মনে পড়ল, তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায়ও দেখেছিলাম জিয়ার নামে আরেকটি সরণি। ওই সুদূরে এক ভ্রমণকারী বাংলাদেশির অন্তর গর্বে ভরে দিলেন জান্নাতবাসী জিয়া। গিনির সিকু তুরে, ফিলিস্তিনের ইয়াসির আরাফাত, ভুটানের রাজা ওয়াং চু, আরও বহু নেতার কাছে শহীদ জিয়াউর রহমান সম্পর্কে উষ্ণ প্রশস্তি শুনেছি। এসব উক্তি রাষ্ট্রাচারের প্রয়োজন-তাড়িত ছিল না, ছিল অন্তর থেকে উৎসারিত আবেগঘন অভিব্যক্তি। এটা অনস্বীকার্য, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নিগৃহীত ও দুর্বল দেশগুলোর মধ্যে ঐক্যবন্ধন সৃষ্টি করে তাদের ন্যায্য দাবি আদায়, দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন সমস্যা সমাধানকল্পে ঐকমত্যের সন্ধান, দুরাচারমুক্ত প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, সৎ ও সাধু জীবনযাপনের মধ্য দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন এবং সুদূরপ্রসারী চিন্তাভাবনা নিয়ে জাতিকে উজ্জীবিত করা—এসব ছিল জিয়ার লক্ষণীয় প্রচেষ্টা ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। অতি স্বল্প সময়ের মধ্যেই একটি বিভ্রান্ত জাতিকে যেন তিনি এক জিয়নকাঠির মায়াবি ছোঁয়ায় আত্মবিশ্বাসী, প্রাণবন্ত ও সক্রিয় করে তুলেছিলেন।
আজ যখন দেশে সত্য ও ন্যায় সর্বক্ষণ পরাভূত হচ্ছে প্রলোভন ও পরাক্রমের প্রতিকারহীন অপরাধে, আজ যখন আইনের শাসন হয়ে পড়েছে এক বিস্মৃত প্রায় জীবনধারা, আজ যখন সরকারি কর্মকাণ্ড দুর্নীতির গভীরতম কন্দরে নিমজ্জিত, আজ যখন স্বৈরাচারী কায়দায় গণতন্ত্রের মৌলিক অধিকার সভা-সমাবেশ হচ্ছে নিষিদ্ধ, আজ যখন বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অভাবে থমকে আছে—তখন শহীদ জিয়াউর রহমানের সময়কে খুব মনে পড়ে। মনে পড়ে তাঁর উদ্দীপনাময় নেতৃত্ব ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, তাঁর সফল ও সবল রাষ্ট্র পরিচালনা, জনগণকে সম্পৃক্ত করে দেশ গড়ার তাঁর নিরলস প্রচেষ্টা। তাঁর পররাষ্ট্রনীতি ছিল না নতজানু ও দেশের স্বার্থের পরিপন্থী। বিশ্বমঞ্চে তখন আমরা দাঁড়িয়েছিলাম মাথা উঁচু করে। সার্বভৌমত্ব ছিল সুরক্ষিত। 

আজ যখন আমরা জাতীয় জীবনে একটি সাংঘর্ষিক অবস্থার মুখোমুখি, যখন অর্থনীতি, শিক্ষাঙ্গন ও আইনশৃঙ্খলা বিপর্যস্ত, যখন সততা ও ন্যায়নিষ্ঠা নির্বাসিত, তখন অবশ্যই জিয়াউর রহমান ও তাঁর নেতৃত্বের কথা মনে পড়ে। বর্তমান অচলাবস্থা নিরসনে একটি নির্দলীয় নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে সাধারণ নির্বাচনের জন্য সমঝোতামূলক পরিবেশে গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়া নির্ধারিত হোক, এটা আমাদের আশা। রাষ্ট্রপতি জিয়ার সার্থক উত্তরসূরি বর্তমান বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া এবং আগামীর নেতা তরুণ তারেক রহমান প্রয়াত নেতা
জিয়াউর রহমানের মহান আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে এই সংকটাবস্থায় বিরোধী দল ও জাতিকে যোগ্য নেতৃত্ব দিয়ে উত্তরণের পথে এগিয়ে নিয়ে যাবেন, এটাই আজ আমাদের ঐকান্তিক কামনা ও বিশ্বাস।
 
 ইনাম আহমদ চৌধুরী: অর্থনীতিবিদ, উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ, বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা। 

বিশ্ব রাজনীতিতে রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমান । অধ্যাপক মুহম্মদ শামস-উল হক

মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা এবং জাতীয় সংসদ, বিশেষ করে সংসদের পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটির মুল্যবান পরামর্শ। এ প্রসঙ্গে, বিশেষ করে জাতীয় ঐকমত্য নির্ধারণে বিরোধী দলের নেতৃবর্গের গঠনমুলক ভুমিকাও উল্লেখযোগ্য।

জাতীয় লক্ষ্য অর্জনে অভ্যন্তরীণ নীতির সম্পুরক হিসেবে পররাষ্ট্র নীতিকে সার্থক এবং কার্যকর ভুমিকা পালন করতে হলে আন্তঃরাষ্ট্র, আঞ্চলিক এবং বিশ্ব রাজনীতির পর্যায়ে ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক শক্তিগুলোর জটিল এবং পরিবর্তনশীল প্রক্রিয়া সম্পর্কে যথোপযুক্ত জ্ঞান এবং সে জ্ঞানের ক্রম নবায়ন অপরিহার্য।

এদিক থেকে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্হাপন করেন। কর্মব্যস্ততা সত্ত্বেও তার পড়ার ও জানার স্বভাবসুলভ আগ্রহ এত বেশি ছিল যে, তিনি বহিঃসম্পর্ক উন্নয়নে পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে সব দলিল, কর্মপত্র এবং সম্পৃক্ত পুস্তকাদি একান্ত যত্মের সঙ্গে পড়তেন এবং মাঝে মাঝেই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এসে একটি দীর্ঘমেয়াদি, কার্যকর, উন্নয়নমুখী, গতিশীল পররাষ্ট্রনীতি রচনা ও বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় কলাকৌশল নিয়ে বিশ্লেষণভিত্তিক আলোচনা করতেন।

এ ধরনের আলোচনাকালে তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, মুক্ত এবং বস্তুনিষ্ঠ দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের চমৎকৃত করে এবং বাংলাদেশের বৈদেশিক সম্পর্কের সার্বিক বিকাশে অতি মুল্যবান পুঁজি হিসেবে কাজ করে। ফলে রাষ্ট্রপ্রধান এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে যে পারস্পরিক আস্হা, সমঝোতা ও সহযোগিতার মনোভাব গড়ে ওঠে, তা বৈদেশিক সম্পর্কের উন্নয়নে কর্মরত সবাইকে নতুন প্রেরণায় উজ্জীবিত করে।

অতি এক নাজুক অবস্হা থেকে বাংলাদেশকে ধাপে ধাপে অগ্রসর হতে হয়েছে এবং এই অগ্রগতির পথে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দুরদৃষ্টি, অসীম ধৈর্য, কুটনৈতিক অন্তদৃêষ্টি এবং আপসের মনোভাব মুল্যবান অবদান রাখে। তার প্রথম উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত দেখতে পাই ১৯৭৭ সালে এপ্রিল মাসের শেষ সপ্তাহে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র দশদিন পরই জোট নিরপেক্ষ ব্যুরোর মন্ত্রী পর্যায়ের অধিবেশনে যোগদানের জন্য আমাকে নতুন দিল্লি যেতে হয়। ৫ এপ্রিল বিকালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মুরারজি দেশাই’র সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতের জন্য ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী পার্লামেন্ট ভবনে তার অফিস কক্ষে আমাকে নিয়ে যান। হৃদ্য পরিবেশে অনুষ্ঠিত এ সাক্ষাৎকালে দুই প্রতিবেশী দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক উন্নয়নের লক্ষ্যে একটি অতি গুরুত্বপুর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। গঙ্গা নদীর পানি-বণ্টন নিয়ে দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে যে তিক্ততার সৃষ্টি হয়েছে তার আশু অবসানকল্পে আলোচনার জন্য ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জগজীবন রাম এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে ঢাকায় আসবেন। এই সিদ্ধান্ত মতো জগজীবন রাম ঢাকায় এসে ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা শুরু করেন। দীর্ঘ আলোচনার পর ফলপ্রসু অগ্রগতি না হওয়ায় জগজীবন রাম রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন ত্যাগ করে বিমানবন্দরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন জানতে পেরে আমরা স্বভাবতই সবাই উদ্বিগ্ন হই। এই আলোচনা আয়োজনে গৃহীত উদ্যোগের সঙ্গে জড়িত থাকায় ব্যক্তিগতভাবে আমি বিশেষ বিব্রত বোধ করি। অনেকটা পীড়াপীড়ি করেই জেনারেল জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তার সচিবালয় অফিসে এক সৌজন্য সাক্ষাতের জন্য ভারতের মন্ত্রী জগজীবন রামকে আনা হয়। তখন দুপুর পার হয়ে গেছে। বিমানবন্দরে জগজীবন রামের বিমান রওনা হওয়ার জন্য প্রস্তুত। এ সৌজন্য সাক্ষাৎ বেশিক্ষণ স্হায়ী হবে বা জগজীবন রাম তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করবেন, ওই পরিস্হিতিতে অপ্রত্যাশিতই ছিল। কুটনীতিতে পেশাগত দক্ষতা বা অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও জেনারেল জিয়াউর রহমান তার ভদ্র, নম্র ও বন্ধুসুলভ আচরণের মাধ্যমে এমন এক পরিবেশের সৃষ্টি করেন যে, এই প্রবীণ রাজনীতিবিদকে প্রায় তিন ঘণ্টাকাল আলোচনায় ব্যস্ত রাখতে সমর্থ হন। সমস্যাটির বস্তুনিষ্ঠ যুক্তি-নির্ভর বিশ্লেষণের ফলে এর সমাধানে মৌল নীতিমালা (ঋড়ৎসঁষধ) উদ্ভাবনে তারা মতৈক্যে উপনীত হন। এ মতৈক্যই ছিল ওই বছরের ৫ নভেম্বরে স্বাক্ষরিত ৫-সালা চুক্তির বুনিয়াদ এবং দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মধ্যে সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক উন্নয়নের পথে এক গুরুত্বপুর্ণ পদক্ষেপ।

স্বাধীনতা যুদ্ধে জিয়াউর রহমানের ঐতিহাসিক ভুমিকা সুবিদিত। কিন্তু এ ভুমিকা পালনে কী ভয়ানক মানবিক যন্ত্রণা তাকে ভোগ করতে হয়, তা প্রথম জানতে পাই তার সঙ্গে রেঙ্গুন সফরকালে। সফরের শেষ পর্যায়ে প্রেসিডেন্ট নে উইনের নৈশভোজের পর রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবনে আমরা ফিরে এসেছি। আমি রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তার ঘর পর্যন্ত যেতেই আমাকে তিনি বসতে অনুরোধ করলেন। উদ্দেশ্য, প্রতিবেশী ব্রহ্মদেশে এই প্রথম সফরের একটি বস্তুনিষ্ঠ মুল্যায়ন। দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কের উন্নয়নে সম্ভাবনা এবং নে উইনের সঙ্গে ব্যক্তিগত পর্যায়ে তার যে আদান-প্রদান হয় তার প্রেক্ষিতে এ সম্পর্ককে কীভাবে আরো অর্থবহ করা যায়, তাকে কেন্দ্র করে বেশ বিস্তৃত আলোচনা হয়।

এ আলোচনাকালে হঠাৎ এক সময় টেলিফোন বেজে উঠল। আমি ধরলাম। তখন রাত প্রায় এগারটা। বর্মায় উপস্হিত আমাদের রাষ্ট্রদুত জানালেন যে, বর্মার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক তাকে জানিয়েছেন কোনোরুপ যুক্তবিবৃতি দেয়ার রেওয়াজ তাদের নেই। কাজেই যুক্ত-বিবৃতি স্বাক্ষরিত হবে না। আমাদের রাষ্ট্রদুত যখন ঢাকায় আসেন, তখনই তাকে এরুপ বিবৃতির একটি খসড়া দেয়া হয়, যেন তিনি যথাসময়ে এবং সফর শেষের আগেই তার প্রতিপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে এবং প্রয়োজনবোধে আমাদের সঙ্গেও আলোচনা করে এ বিবৃতিকে চুড়ান্ত করা হয়। শেষ মুহুর্তে এরুপ হবে তা কেউ আশা করেনি। নৈশভোজের আগেই এ সম্পর্কে জানতে পারলে প্রেসিডেন্ট নে উইনকে বলা যেত। পরের দিন সকালেই রেঙ্গুন বিমানবন্দর ত্যাগ করে ঢাকায় প্রত্যাবর্তন করতে হবে। এই স্বল্পসময়ে প্রেসিডেন্ট নে উইনের হস্তক্ষেপ ছাড়া যুক্তবিবৃতি প্রকাশের কোনো সম্ভাবনাই ছিল না। কাজেই প্রেসিডেন্ট নে উইনের বাসভবনে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান টেলিফোন করেন, কিন্তু সেখানে তাকে পাওয়া গেল না এবং কোথায় পাওয়া যাবে তাও কেউ বলতে পারল না। এ অবস্হায় স্হির হলো পরের দিন প্রত্যুষেই তাকে টেলিফোন করা হবে। স্বভাবতই এই পরিস্হিতিতে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বিরক্ত হলেন, কিন্তু ঠিক বিচলিত হলেন না। মনে হলো, এই অপ্রত্যাশিত অবস্হায় তার মনে যে অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে, তাকে আয়ত্তাধীনে আনতে চেষ্টা করছেন।

এ জন্যই বোধ হয় আমাকে অনুরোধ করলেন যদি খুব পরিশ্রান্ত না হয়ে থাকি, আরো কিছুক্ষণ বসতে। স্বাধীনতা যুদ্ধসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ চলল প্রায় রাত ১২টা পর্যন্ত। তার ব্যক্তিগত জীবনের কিছু কিছু কথা এই প্রথমবারের মতো আমাকে বললেন এবং তার মুখমন্ডলে দেখতে পেলাম এক প্রশান্তি ও আত্মবিশ্বাসের ছাপ। এই প্রথম জানতে পারলাম যে সমগ্র ন’মাস যুদ্ধকালে তার স্ত্রী এবং দুই ছেলে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে দুঃসহ বন্দি জীবন যাপন করেন এবং তাদের নিরাপত্তা বিপন্ন জেনে স্বামী এবং পিতা হিসেবে তার মানসিক যন্ত্রণা সহজেই অনুমেয়। কিন্তু বার বার প্রতিপক্ষ ভীতি প্রদর্শন করে চিঠি লিখে এ যন্ত্রণাকে আরো তীব্রতর করে। এ মানসিক যন্ত্রণা নিয়েই যুদ্ধে জয়যুক্ত না হওয়া পর্যন্ত একজন সেনানায়ক হিসেবে তার দায়িত্ব পালনে তিনি অবিচল থাকেন। তার জীবনের এ ঘটনা আমার মনকে গভীরভাবে স্পর্শ করে এবং স্বাধীনতা যুদ্ধে তার নির্ভীক এবং আত্মনিবেদিত ভুমিকা নতুন আলোকে দেখতে পাওয়ার সুযোগ হয়। সেদিন আরো জানলাম যে, তার জীবনের আকাঙ্ক্ষা ছিল অর্থনীতিতে গবেষণা করে শিক্ষকতা করা। শিক্ষকের প্রতি তার স্বভাবসুলভ সৌজন্য ও শ্রদ্ধাশীলতার এটাই বোধহয় একটি কারণ ছিল। পরের দিন প্রত্যুষে প্রেসিডেন্ট নে উইনকে টেলিফোনে অনুরোধ করার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি যুক্তবিবৃতি প্রকাশে সম্মত হয়ে এ জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।

কঠিন সমস্যা এবং সঙ্কটের মুখে বিচলিত না হওয়া তার একটা চারিত্রিক গুণ ছিল। এর বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে। এ প্রসঙ্গে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ১৯৭৯ সালে তেহরানে মার্কিন দুতাবাসের কর্মকর্তাদের দুতাবাসে বন্দি করা হতে উদ্ভুত সঙ্কট। কুটনৈতিক কর্মকর্তা আটক করা জেনেভা কনভেনশন এবং প্রচলিত আন্তর্জাতিক রীতিনীতির পরিপন্হী[ &ৗ২৫০৯; ]। এ সময় নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ এ সঙ্কটের আশু সমাধানের জন্য পরিষদের ভেতরে ও বাইরে সক্রিয় ভুমিকা পালন করে। ইরান নিরাপত্তা পরিষদের সুপারিশ সত্ত্বেও এদের মুক্তি দিতে অনিচ্ছা প্রকাশ করায় মার্কিন সরকার ইরানের বিরুদ্ধে ঢ়থষধয়মসষঢ় আরোপের জন্য একটি প্রস্তাব নিরাপত্তা পরিষদের স্হায়ী সদস্যদের সঙ্গে পরামর্শ করে পেশ করে। এই প্রস্তাব বিবেচনার প্রাক্কালে প্রেসিডেন্ট কার্টার রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে টেলিফোন করে বাংলাদেশের সমর্থনের জন্যে বিশেষভাবে অনুরোধ করেন। তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সর্বাধিক সাহায্যদাতা এবং ১৯৭৯ সালে দেশের এক বিস্তৃত অংশ বন্যাকবলিত হওয়ার ফলে পিএল ৪৮০-এর অধীনে যুক্তরাষ্ট্র হতে খাদ্য-সাহায্যের প্রয়োজনীয়তাও ছিল বিশেষ গুরুত্বপুর্ণ। আমাদের দুতাবাস থেকে প্রাপ্ত সংবাদ অনুযায়ী ইরানের আচরণে সমগ্র যুক্তরাষ্ট্রে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের সৃষ্টির প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সমর্থনের ওপর বাংলাদেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ সাহায্য নির্ভর করবে। কাজেই জাতীয় স্বার্থের দিক থেকে ইরান-মার্কিন সমস্যা এক বিরাট হুমকির রুপ পরিগ্রহ করে।

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান প্রেসিডেন্ট কার্টারকে সৌজন্যের সঙ্গে জানান, মন্ত্রিসভার সঙ্গে পরামর্শের পর আবার তার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিশ্রুতি না দিয়ে তিনি যে রাজনৈতিক বিচক্ষণতা প্রদর্শন করেন, পরবর্তী ঘটনাবলী হতে তা সুস্পষ্ট হয়। নিরাপত্তা পরিষদে বাংলাদেশ প্রধানত জোট নিরপেক্ষ ও তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর ভোটে নির্বাচিত হয়। এসব রাষ্ট্রের, বিশেষ করে এশিয়ার প্রধান মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর মত যাচাই করে এ সিদ্ধান্তে আসা হয় যে, ঢ়থষধয়মসষঢ় জিম্মিদের মুক্তিতে ফলপ্রসু না হয়ে সম্পুর্ণ বিরুপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করার আশঙ্কাই বেশি, বিশেষত ইরানে তখন বিরাজমান নাজুক পরিস্হিতি। এই বিশ্লেষণের আলোকে ঢাকাস্হ মার্কিন রাষ্ট্রদুতের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এ বিষয়ে মতের আদান-প্রদান সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র তার সিদ্ধান্তে অনড় থাকে। নিরাপত্তা পরিষদে বিষয়টি বিবেচনার সময় বাংলাদেশের কী বক্তব্য হবে, তার একটি খসড়া মন্ত্রিসভায় উপস্হাপন করা হয়। সুদীর্ঘ আলোচনার পর মন্ত্রিসভা এ বক্তব্য অনুমোদন করে। বাংলাদেশের স্হায়ী প্রতিনিধি নিরাপত্তা পরিষদের অধিবেশনে এ বক্তব্য পেশ করেন এবং ভোট দান থেকে বিরত থাকেন। বাংলাদেশ যে নীতি গ্রহণ করে তার যৌক্তিকতা পরবর্তী ঘটনাবলী হতে সুপ্রমাণিত হয়।

১৯৮০ সালের জুন মাসে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তেল সঙ্কটের ওপর জাতিসংঘের বিশেষ অধিবেশনে তার যুক্তিনির্ভর এবং দলমত নির্বিশেষে সবার প্রশংসিত ভাষণ প্রদানের পর প্রেসিডেন্ট কার্টারের আমন্ত্রণে তার সঙ্গে এক সাক্ষাতে মিলিত হন। এ সাক্ষাৎ ছিল খুবই হৃদ্যতাপুর্ণ। আলোচনা শেষে প্রচলিত রীতি অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট কার্টার রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানসহ ডভময়প ঐসৎঢ়প জসঢ়প এথড়নপষ-এ সংবাদ মাধ্যম প্রতিনিধিদের সামনে উপস্হিত হন এবং রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বের প্রশংসাসুচক বক্তব্যে তাকে একজন বিজ্ঞ রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে উল্লেখ করেন। জিম্মি সঙ্কটের পটভুমিতে এ প্রশংসা স্বভাবতই আমাদের সবাইকে চমৎকৃত করে।
আলোচনায় প্রতিপক্ষের আস্হা অর্জনে তার প্রধান হাতিয়ার ছিল তার সৌজন্য, বন্ধুসুলভ আচরণ এবং পুর্বপ্রস্তুতিভিত্তিক যুক্তি-নির্ভর বিশ্লেষণের ক্ষমতা। এর একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ছিল ইসলামিক শান্তি কমিটির পক্ষে ইরান ও ইরাকের সঙ্গে আলোচনার জন্য কমিটির একক প্রতিনিধি হিসেবে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নির্বাচন। ১৯৮১ সালের এপ্রিল মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে সংগঠিত এই একক মিশনের প্রচেষ্টা অপ্রত্যাশিতভাবে ফলপ্রসু হয়, কারণ ইরান ও ইরাকের রাষ্ট্রপ্রধানরা যুদ্ধ অবসানের জন্য প্রয়োজনীয় শর্তগুলো সম্পর্কে প্রথমবারের মতো ঐকমত্যে উপনীত হন এবং এসব শর্ত বাস্তবায়নের জন্য যুদ্ধবিরতি কমিশনসহ অন্যান্য ৩টি কমিশনে কারা সদস্য হবে, সে সম্পর্কেও উভয় রাষ্ট্রপ্রধান সম্মত হন। দুর্ভাগ্য যে, এ সর্বসম্মত শান্তিপ্রস্তাব বাস্তবায়নের আগেই রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শহীদ হন এবং প্রেসিডেন্ট বনি সদরকে দেশ ছেড়ে চলে যেতে হয়।

বাংলাদেশের বহিঃসম্পর্ক উন্নয়নে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের বহুমুখী অবদানের কথা বলতে গেলে অনেক ঘটনাই স্মৃতির কোঠায় ভিড় করে। বর্তমান প্রবন্ধের সংক্ষিপ্ত পরিসরে তার বর্ণনা সম্ভব নয়। তবে দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক সহযোগিতা প্রতিষ্ঠার জন্য তার ঐতিহাসিক অবদান সম্পর্কে কিছু না বললে বর্তমান অসম্পুর্ণ থেকে যাবে। আগেই উল্লেখিত হয়েছে যে, তার কর্মব্যস্ততা সত্ত্বেও দ্বিপাক্ষিক, আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষণ ও বস্তুনিষ্ঠ আলোচনায় তার আগ্রহ ছিল সীমাহীন। তিনি ছিলেন এক মুক্ত ও সৃজনশীল মনের অধিকারী। তিনি উপলব্ধি করতে পারেন যে, দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে বিরাজমান প্রতিকুল রাজনৈতিক পরিবেশকে পরিবর্তন করে আঞ্চলিক শান্তি ও স্হিতিশীলতা জাতীয় উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য। নিঃসন্দেহে এরুপ সহযোগিতার পথে বিরাজমান প্রধান প্রতিবন্ধকটি মানসিক এবং ঐতিহাসিক স্মৃতির গভীরে গ্রোথিত। তবে আমাদের বিশ্লেষণ হতে প্রতীয়মান হয় যে, এসব প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করা সম্ভব এবং জাতীয় স্বার্থেই সে প্রচেষ্টা গ্রহণ বাঞ্ছনীয়। এ লক্ষ্যে রাষ্ট্রপতি জিয়া নিজেকে সম্পুর্ণভাবে নিবেদিত করেন এবং ১৯৭৭ সাল হতে পরিচালিত তার নিরলস চেষ্টার ফসল ‘সার্ক’।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতির রচনায় ও বিকাশে তার প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেয়ে আমি সম্মানিত বোধ করি। এই দীর্ঘ সময়ে এবং তার রাজনৈতিক দলের সদস্য না হওয়া সত্ত্বেও তিনি আমার প্রতি সতত যে সৌজন্য, হৃদ্যতা ও আস্হা প্রদর্শন করেছেন, তা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করি এবং আবারো তার পবিত্র স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করি।

লেখকঃ মরহুম, জাতীয় অধ্যাপক ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী

The Daily Amardesh
19 January 2009

যে আদর্শের বিকল্প নেই । অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ

রাজনীতি বিজ্ঞানে ‘জাতীয়তাবাদ তত্ত্বের’ মধ্যে দুটি তত্ত্ব সাম্প্রতিককালে বহুলভাবে আলোচিত। এর একটিতে বলা হয়েছে,%ঊঘএখওঝঐ% ?ঞযব হধঃরড়হ পৎবধঃবংঃযব ংঃধঃব?%/ঊঘএখওঝঐ% এবং অপরটিতে বলা হয়েছে, ?ঞযব ংঃধঃব পৎবধঃবংঃযব হধঃরড়হ? অর্থাৎ জাতি রাষ্ট্র গঠনের কারক, অপরপক্ষে রাষ্ট্র জাতি গঠনের কারক। প্রথম প্রপঞ্চটি ইউরোপের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আর দ্বিতীয়টি উপনিবেশোত্তর এশিয়া ও আফ্রিকার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। ইউরোপে জাতি গঠনের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় মানচিত্রের উদ্ভব রাষ্ট্র ও জাতি উভয়কেই দিয়েছে একটি টেকসই চরিত্র। এশিয়া ও আফ্রিকার ক্ষেত্রে উপনিবেশবাদ থেকে মুক্ত হয়ে যেসব রাষ্ট্রের উৎপত্তি হয়েছে, সেগুলো অবশ্যম্ভাবীরুপে জাতিতে রুপান্তরিত হতে পারেনি কিংবা এই রুপান্তরের পথে দুরতিক্রম্য বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হয়েছে।

মানব সন্তানদের একটি অংশকে জাতি হিসেবে তখনই গণ্য করা যায় যখন তারা নিজেদের মধ্যে স্বেচ্ছামুলক অনুভুতির বন্ধনে ঐক্যবদ্ধ হয়। এই সমানুভুতি মানবগোষ্ঠীর এই নির্দিষ্ট অংশ অন্য কারোর সঙ্গে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে অনুভব করতে চায় না। এই সমানুভুতির ফলে তারা একে অপরের সঙ্গে সহেযাগিতা করে, যা তারা অন্য লোকের সঙ্গে করে না। তারা সবাই একসঙ্গে বাস করতে চায় এবং কামনা করে যে, সরকার তাদের দ্বারা অথবা তাদের মধ্য থেকে নেয়া ব্যক্তিবর্গকে দিয়ে গঠিত হবে। জাতি গঠনের জন্য এই ধরনের সমানুভুতি অপরিহার্য।

১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা অর্জনের এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে জওহরলাল নেহরু একজন বিরোধী রাজনীতিক থেকে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রচন্ড অস্বস্তিকর অবস্হায় পড়েছিলেন। ক্ষমতালাভের পর তাকে যেন একটি নীতি কার্যকর করতে হয়েছিল, যা তিনি তার কংগ্রেস রাজনীতির মধ্য দিয়ে প্রচার করেছেন। অথচ কখনো পছন্দ করেননি। প্যাটেল ও সীতারামাইয়ার সঙ্গে তিনিও ভাষাভিত্তিক প্রদেশ গঠন কমিটির সদস্য হয়েছিলেন। প্রায় প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই কংগ্রেস ভারতে ভাষাভিত্তিক প্রদেশ গঠনের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল এবং ব্রিটিশ শাসকদের ভাষাভিত্তিক বিবর্জিত স্বৈরাচারী প্রশাসনিক ইউনিট গঠনের বিরোধিতা করে আসছিল। যুক্তি ছিল, ভাষার ভিত্তিতে প্রদেশ গঠন না করে ব্রিটিশরা সাম্রাজ্যবাদী ‘ভাগ কর ও শাসন কর’ নীতি অনুসরণ করেছে। ভাষাভিত্তিক প্রদেশ গঠন কমিটিতে কাজ করতে গিয়ে নেহরু তার তিক্ত অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেছেনঃ (This inquiry) has been in some ways an eye-opener for us, the work of 60 years of The Indian National Congress was standing before us, face to face with centuries-old India of narrow loyalties, petty jealousies and ignorant prejudices engaged in mortal conflict and we were simply horrified to see how thin was the ice upon which we were skating. Some of the ablest men in the country came before us and confidently and emphatically stated that language in this country stood for and represented culture, race, history, individuality and finally a sub-nation.

আতঙ্কিত বোধ করে থাকুন বা নাই থাকুন, নেহরু, প্যাটেল এবং সীতারামাইয়া অবশেষে অন্ধ্রকে তেলেগু ভাষী রাজ্য হিসেবে স্বীকার করে নিতে বাধ্য হলেন। যে হালকা বরফের আস্তরণের ওপর নেহরু স্কেটিং খেলার কথা বলেছেন, তা ভেঙে গেল। এক দশকের মধ্যে সমগ্র ভারতীয় প্রশাসনকে ভাষার ভিত্তিতে পুনর্গঠন করা হলো। দেশ-বিদেশের পন্ডিত ও চিন্তাবিদরা ভাবতে শুরু করলেন, যেভাবে সঙ্কীর্ণ আনুগত্য, ক্ষুদ্র হিংসা-বিদ্বেষ ও মুর্খ সংস্কারকে প্রশ্রয় দেয়া হলো তাতে করে ভারত এক রাষ্ট্র হিসেবে কতদিন টিকে থাকবে। নবগঠিত ভারত রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে নেহরু যেই সমস্যা ভাষার মধ্যে দেখেছিলেন, এশিয়া-আফ্রিকায় নবগঠিত রাষ্ট্রগুলোর ক্ষেত্রে সে সমস্যা দ্বি-বাচনিক অথবা বহুবাচনিক অথবা বহুতর বাচনিক সমাজের সমস্যা হিসেবে প্রতিভাত হয়েছে। কখনো বলা হয়েছে, এই সমস্যা যৌগিক সমাজ অথবা নিম্ন সমাজের সমস্যা। কখনো বলা হয়েছে, এগুলো রাষ্ট্র, কিন্তু জাতি নয়। আবার কখনো বলা হয়েছে, এগুলো জাতি বটে, রাষ্ট্র হতে পারেনি। আবার কখনো বা গ্রোত্রবাদ, সঙ্কীর্ণতাবাদ, সাম্প্রদায়িকতাবাদ অথবা অধিজাতীয়তাবাদের সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ভারতের ক্ষেত্রে সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মীয় বৈপরীত্য, মালয়েশিয়ার ক্ষেত্রে জাতিগত বৈপরীত্য এবং কঙ্গোর ক্ষেত্রে গ্রোত্রগত বৈপরীত্য নির্দেশ করে।

ইন্দোনেশিয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা হলো, আঞ্চলিক অসন্তোষ আর মরক্কোর ক্ষেত্রে সমস্যা হলো সামাজিক প্রথা-আচরণে পার্থক্য। শ্রীলঙ্কায় সংখ্যালঘু তামিলরা সংখ্যাগুরু সিংহলিদের থেকে ভাষা, জাতিগত বৈশিষ্ট্য, আঞ্চলিক অবস্হান এবং সামাজিক প্রথার বিচারে পৃথক। ইরাকের ক্ষেত্রে একই ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী শিয়া ও সুন্নীদের মধ্যে রয়েছে বিরোধ। এভাবে কুর্দিস্তান, লাওস, বর্মা ও থাইল্যান্ডে জাতি, গোত্র এবং ভাষাগত বিরোধ রয়েছে। সম্প্রদায়ের প্রতি আনুগত্য শেষ বিচারে রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যে পরিণত নাও হতে পারে। রাষ্ট্র যখন সম্প্রদায়গুলোকে একটি চুড়ান্ত সম্প্রদায়ে রুপ দিতে সক্ষম হয়, তখনই একটি রাষ্ট্র জাতির বৈশিষ্ট্য অর্জন করে। এ ক্ষেত্রে জাতির কথা না বলে চুড়ান্ত আনুগত্যের কথা বলাই শ্রেয়। ইমারসনের দৃষ্টিতে জাতি হলোঃ%ঊঘএখওঝঐ% ?ঞবৎসরহধষ পড়সসঁহরঃুঃযব ষধৎমবংঃ পড়সসঁহরঃুঃযধঃ, যিবহঃযব পযরঢ়ং ধৎব ফড়হি, বভভবপঃরাবষু পড়সসধহফং সবহ?ং ষড়ুধষঃু, ড়াবৎৎরফরহমঃযব পষধরসং নড়ঃয ড়ভঃযব ষবংংবৎ পড়সসঁহরঃরবং রিঃযরহ রঃ ধহফঃযড়ংবঃযধঃ পঁঃ ধপৎড়ংং রঃ ড়ৎ ঢ়ড়ঃবহঃরধষষু বহভড়ষফ রঃ রিঃযরহ ধ ংঃরষষ মৎবধঃবৎ ংড়পরবঃু...?%/ঊঘএখওঝঐ%

ইমারসনের দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচার করলে সঙ্গতভাবে প্রশ্ন উঠতে পারে, অনাগত দিনের সঙ্কটে ভারত, ইন্দোনেশিয়া অথবা নাইজিরিয়া জাতি হিসেবে উত্তরণে সক্ষম হবে কিনা। ১৯৭১-এ একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের উদ্ভব হয়। ভাষা, ধর্ম, ভুগোল, সংস্কৃতি ও লোকাচারের দৃষ্টিতে বাংলাদেশ একটি সমধর্মী রাষ্ট্র। এতদসত্ত্বেও বাংলাদেশ আজ অবধি একটি জাতি রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে উঠেছে কিনা তা প্রশ্নাতীত নয়। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের উদ্ভবলগ্নে যে পার্থক্য এই রাষ্ট্রকে জাতি হিসেবে সুসংহত হতে বাধা সৃষ্টি করে, তা মুলত আদর্শিক। আমাদের জাতি গঠনের সমস্যা ভারত, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া অথবা মালয়েশিয়ার অনুরুপ নয়। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে এসব দেশে ভাষাগত, জাতিগত, কৃষ্টিগত অথবা অঞ্চলগত বিরোধ জাতি গঠনের অন্তরায়; কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এসব সমস্যা না থাকা সত্ত্বেও জাতি গঠন কেন পরিপুর্ণভাবে সম্ভব হলো না-সেই প্রশ্ন স্ববিরোধী মনে হতে পারে। আসলে কি তাই? বাংলাদেশের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে জনগোষ্ঠীর মধ্যকার দ্বন্দ্বটি একান্তই আদর্শিক। ’৭১-এ যখন মুক্তিযুদ্ধ হয় তখন এ দেশের জনগোষ্ঠীর একটি অংশ (ক্ষুদ্র অংশ হলেও) পাকিস্তান বিশ্বাস করত। সেই অংশটি অবিভক্ত ব্রিটিশ-ভারতে সংখ্যাগরিষ্ঠের হাতে মুসলিম জনগোষ্ঠীর বঞ্চনার কথা ভুলতে পারেনি। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের উদ্ভবের পর যে দলটি ক্ষমতাসীন হয়েছিল তাদের দায়িত্ব ছিল জাতি গঠনের স্বার্থে এই আদর্শিক দ্বন্দ্বের রাজনীতিসম্মত সুরাহা করা। বাংলাদেশকে একান্তভাবেই ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করে এই দলটি আত্মবিরোধের জন্ম দিল। আমাদের সংবিধানে বলা হয়েছে, ১৯৪৭-এর ১৪ আগষ্ট যে ভুখন্ড নিয়ে তৎকালীন পুর্ব পাকিস্তান গঠিত হয়েছিল তাই হবে বাংলাদেশ। অথচ র‌্যাটক্লিফের রোয়েদাদে পুর্ব পাকিস্তানের যে মানচিত্র, সে মানচিত্রের ভিত্তি ছিল এ দেশেরই সংখ্যাগুরু মানুষের ধর্ম। পশ্চিমবঙ্গের লোকেরাও বাংলা ভাষায় কথা বলে, কিন্তু তারা এবং তাদের নেতারা ১৯৪৭-এ ভাষার ভিত্তিতে তৎকালীন পুর্ববঙ্গের সঙ্গে মিলিত হয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করতে চাননি। ইমারসন যে আনুগত্যের কথা বলেছেন, সেই আনুগত্যের বিচারে তারা দিল্লিকেন্দ্রিক ভারত রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত। নিজেদের সত্তার পরিচয় দিতে গিয়ে তারা বলে থাকেন, তারা হলেন ভারতীয় এবং ভারতীয় বাঙালি। সুতরাং এটা অত্যন্ত স্পষ্ট যে, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভিত্তি এবং এর জাতিগত পরিচয় শুধু ভাষাভিত্তিক হতে পারে না। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অধীনে একটি সুসংহত জাতি গঠন করতে হলে ভাষা ও ধর্ম-এর দুটোকেই গুরুত্ব দিতে হয়। আমাদের জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই দুটোরই আবেগানুভুতি প্রবল। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর পর যে সংবিধান গৃহীত হয়, তাতে ‘ধর্মনিরপেক্ষতাকে’ রাষ্ট্রীয় আদর্শ হিসেবে ঘোষণা করায় এ দেশের জনগোষ্ঠীর বিপুল অংশের ধর্মানুভুতি আহত হয়। অথচ জাতীয় সংহতির স্বার্থে প্রয়োজন ছিল এ রকম আহত অনুভুতির উদ্ভব না ঘটানো।

বাংলাদেশের অভ্যুদয়কালীন এবং অভ্যুদয়ের অব্যবহতি পর যে দলটি ক্ষমতায় গিয়েছিল তারা জাতীয় ঐক্যের কথা চিন্তা না করে জাতীয় জীবনে একটি আদর্শিক ফাটল সৃষ্টি করে। এই ফাটল আরো প্রবল আকার ধারণ করে স্বাধীনতার স্বপক্ষ ও বিপক্ষ শক্তির বিভেদাত্মক ্লোগানের ফলে। অথচ নবীন রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল জাতীয় ঐক্যের। হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান সবার ধর্মানুভুতিকে স্বীকার করে নেয়া এবং যুদ্ধকালীন বিরোধের ইতি ঘটিয়ে একটি সহমত সৃষ্টি করাই ছিল জাতীয় ঐক্য অর্জনের প্রশস্ত পথ; কিন্তু সেই পথে তো এই দলটি গেলই না, বরঞ্চ ১৯৭৫-এ বহুদলীয় গণতন্ত্রের কবর রচনা করে একদলীয় শাসন কায়েম করে বিভিন্ন বিরোধী মত ও আদর্শের নিরাপদে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হওয়ার যে সুযোগ ছিল, তারও কবর রচনা করা হলো। এর ফলে আদর্শিক দ্বন্দ্বের উত্তাপ প্রশমিত হওয়ার আর কোনো সুযোগই রইল না। অন্যদিকে ’৭২-এ সংবিধান প্রণেতারা মারাত্মক একটি স্ববিরোধিতার জন্ম দিয়েছিলেন। কারণ এই সংবিধানে বাংলাদেশের সব নাগরিকের ভোটাধিকারের স্বীকৃতি দেয়া হয়েছিল, অথচ নিজ নিজ আদর্শের ভিত্তিতে সব ধরনের দল গঠনের নিশ্চয়তা ছিল না। ধর্মীয় দলগুলো ছিল নিষিদ্ধ। এসব কারণে বাংলাদেশের অন্তর্গত জনগোষ্ঠীর মধ্যে বহুমাত্রিক সমধর্মিতা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ রাষ্ট্র জাতি হিসেবে গড়ে উঠতে সক্ষম হলো না।

১৯৭৫-এর ৭ নভেম্বর ঐতিহাসিক সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জিয়াউর রহমান এ দেশের রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে পরিবৃত হলেন। একজন সফল রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে জিয়াউর রহমানের বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় অবদান ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’, যা এই রাষ্ট্রের অন্তর্গত সব মানুষকে সত্তার পরিচয় আবিষ্কারে একটি আদর্শগত ভিত্তি দিয়েছে। এই ভিত্তি জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিদ্যমান আদর্শিক দ্বন্দ্ব নিরসনে সুদুরপ্রসারী অবদান রাখতে সক্ষম হবে। জিয়াউর রহমান লিখেছেন, ‘এই পর্যায়ে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের মুল বিষয়গুলো ব্যাখ্যার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে, যা ছাড়া জাতীয়তাবাদী দর্শনের আন্দোলন এবং তার মুল লক্ষ্য, অর্থাৎ শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার কাজ হয়ে পড়বে অসম্পুর্ণ, ত্রুটিপুর্ণ ও বিভ্রান্তিকর। আমরা বলতে পারি, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদে মোটামুটি সাতটি মৌলিক বিবেচ্য বিষয় রয়েছে, যা হচ্ছেঃ

১. বাংলাদেশের ভুমি; অর্থাৎ আন্তর্জাতিক সীমানার মধ্যবর্তী আমাদের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক এলাকা, ২, ধর্ম ও গোত্র নির্বিশেষে দেশের জনগণ, ৩. আমাদের ভাষা বাংলা ভাষা, ৪. আমাদের সংস্কৃতি জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা, উদ্দীপনা ও আন্তরিকতার ধারক ও বাহক আমাদের নিজস্ব কৃষ্টি ও সংস্কৃতি, ৫. দু’শ’ বছর উপনিবেশ থাকার প্রেক্ষাপটে বিশেষ অর্থনৈতিক বিবেচনার বৈপ্লবিক দিক, ৬. আমাদের ধর্ম প্রতিটি নারী ও পুরুষের অবাধে তাদের নিজ নিজ ধর্মীয় অনুশাসন ও রীতিনীতি পালনের পুর্ণ স্বাধীনতা, ৭. সর্বোপরি, আমাদের ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ, যার মধ্য দিয়ে আমাদের বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের দর্শন বাস্তব ও চুড়ান্ত রুপ লাভ করেছে।

জিয়াউর রহমান বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের যে সাতটি ভিত্তির কথা বলেছেন, সেই ৭টি নীতির সফল রুপায়নই বাংলাদেশের অন্তর্গত জনগোষ্ঠীকে সমানুভুতির মানুষে পরিণত করতে পারে। একে রুপান্তরিত করতে পারে সর্বোচ্চ সম্প্রদায়গত সংহতিতে এবং সঙ্কটে একাট্টা হতে।

এতেই কেবল বাংলাদেশ রাষ্ট্র থেকে জাতিতে উত্তরণে সক্ষম হবে। জিয়াউর রহমানের আরেকটি বড় অবদান-বহুদলীয় গণতন্ত্র। এই বহুদলীয় গণতন্ত্র ’৭২-এর সংবিধানে নির্দেশিত খন্ডিত বহুদলীয় গণতন্ত্র নয়। জিয়াউর রহমান প্রবর্তিত বহুদলীয় গণতন্ত্রের সুবাদে সব মত ও পথের মানুষ রাষ্ট্রক্ষমতার অঙ্গনে নিরাপদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ পেয়েছে। বহুদলীয় গণতন্ত্রের এই ধারা বাংলাদেশে জাতীয় সংহতি অর্জনের পথকে সুগম করে দিয়েছে। আজ জিয়াউর রহমান নেই, রয়েছে তার কালজয়ী আদর্শ বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ। আগামী দিনে বাংলাদেশী জাতি রাষ্ট্র গঠনের জন্য এই আদর্শের কোনো বিকল্প নেই। আজ বাংলাদেশে যে বিপর্যস্ত সময় চলছে, তা থেকে উত্তরণের জন্য বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদই হতে পারে একমাত্র আদর্শিক ভিত্তি।

The Daily Amardesh
19 January 2009

জনগণের জন্য সৌভাগ্য বয়ে এনেছিলেন রাষ্ট্রপতি জিয়া

জনগণের জন্য সৌভাগ্য বয়ে এনেছিলেন রাষ্ট্রপতি জিয়া । ড. তালুকদার মনিরুজ্জামান

স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও দেশপ্রেম প্রত্যয় তিনটি ধারণ করে একজন রাজনীতিক দেশের প্রকৃত সেবায় নিজেকে নিয়োগ করলে সেটি ওই দেশটির জনগণের জন্য সৌভাগ্য। কিন্তু সে রাজনীতিতে ক্ষমতার প্রতি লালসা গুরুত্ব পাবে কম। আমাদের এই বাংলাদেশে জনগণের এ ধরনের একশ’ ভাগ সৌভাগ্যের দরজা খুলে দিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।

রাজনীতিতে আসার পর জিয়াউর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষকের সঙ্গে মাঝে মাঝে পরামর্শ করতেন। আমার সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ইস্যু নিয়ে আলোচনা করেছেন। মুলত আমাদের ট্র্যাডিশনাল রাজনীতিকের চেয়ে তার চিন্তাদর্শন ছিল কিছুটা ভিন্ন।

মুখে মুখে নয়, তিনি আসলেই বিশ্বাস করতেন-জনগণই ক্ষমতার উৎস। তিনি মনে করতেন, গ্রামের উন্নতির অর্থ হচ্ছে বাংলাদেশের উন্নতি হওয়া। এ জন্য তিনি বিভিন্ন প্রকল্প ও পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন। কৃষি উন্নয়নে তিনি খালকাটা কর্মসুচি গ্রহণ করেছিলেন। এই কর্মসুচির পুরোপুরি বাস্তবায়ন হলে শুষ্ক মৌসুমে পানির সঙ্কট দেখা দিত না। বর্ষা মৌসুমে পানি ধরে রাখা যেত।

তার রাজনৈতিক ও পারিবারিক জীবন নিয়ে আমি বিভিন্ন সময়ে লেখালেখিও করেছি। ১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি জিয়াউর রহমান বগুড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। ’৭১ সালে জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা যেমন এ দেশের মুক্তিকামী মানুষকে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে সাহস ও প্রেরণা যুগিয়েছিল, তেমনি ’৭৫ সালে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব যখন হুমকির মুখে তখন সিপাহী-জনতার যে অভ্যুত্থান হয় তারই ধারাবাহিকতায় তিনি ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে আসেন। বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে তিনি বাংলাদেশের মানুষের মাঝে আরো বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠেন। জিয়াউর রহমান ১৯ দফা কর্মসুচি দিয়ে দেশে উন্ন্নয়ন ও উৎপাদনের রাজনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যান।

একজন শাসক তখনই রাষ্ট্রনায়কে পরিণত হন, যখন তিনি দেশের বর্তমানের চেয়েও ভবিষ্যতের চিন্তা করেন বেশি। জিয়াউর রহমান ছিলেন তেমনিই একজন শাসক। দুরদর্শী এই নেতা শুধু বাংলাদেশের বর্তমান নিয়েই চিন্তা করতেন না, ভবিষ্যৎ নিয়েও ভাবতেন। তিনি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে তার শাসনামলের বেশির ভাগ সময় ব্যস্ত ছিলেন। শক্তিশালী ও আধুনিক সেনাবাহিনী গঠন, আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্হা সার্ক গঠনের আকাঙ্ক্ষা এবং মুসলমান অধ্যুসিত রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে কুটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে অটুট রেখে, রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা ও অন্যান্য রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠার সুযোগ দিয়ে তিনি একজন সফল রাষ্ট্রনায়কে পরিণত হন।

তিনি স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিলেন যে, বাংলাদেশের টিকে থাকার জন্য একটি শক্তিশালী ও শৃঙ্খলাপরায়ণ আর্মি প্রয়োজন। তাই আমাদের দেশে এমন আর্মি গড়ে তোলার জন্য পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। বিশেষ করে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা প্রদান করে আর্মির মধ্যে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছেন তিনি। এক্ষেত্রে একটি কথা মনে রাখা দরকার, যদিও তিনি সেনাবাহিনী গড়ে তোলেন, তবু তিনি সব সময় বলতেন সেনাবাহিনীর ভুমিকা ও রাজনীতিবিদদের ভুমিকা পৃথক। তার মতে, রাষ্ট্রের স্বার্থেই %ঊঘএখওঝঐ%‘অৎসবফ ভড়ৎপবং ংযড়ঁষফ নব ঁহফবৎঃযব পড়হঃৎড়ষ ড়ভঃযব ঢ়ড়ষরঃরপরধহং.?%/ঊঘএখওঝঐ% এ জন্য তিনি হসলময়মধথল হড়সধপঢ়ঢ় ফিরিয়ে এনেছিলেন। শেখ মুজিব যে একদলীয় শাসন বা বাকশাল করেছিলেন, তাকে সঠিক মনে করতেন না। এ জন্য তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্রের পদ্ধতিও পুনরুদ্ধার করেন। তিনি জানতেন, রাজনীতিকে ঠিকমত চালাতে হলে, সুন্দর করে রাজনীতি করতে হলে শক্তিশালী রাজনৈতিক দলের দরকার। সে জন্য তিনি নিজে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। অন্যান্য দলকেও রাজনীতিতে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেন। জিয়াউর রহমান সামরিক বাহিনীর সদস্য হয়েও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর বিশ্বাস করেছিলেন। বাংলাদেশে তিনিই প্রথম ফ্রি ইলেকশন করেন। তার সময়ে বিভিন্ন দল সংসদে আসন লাভ করে। তিনি এই কথা বলতে বেশি পছন্দ করতেন যে, Politics should be made by politicians and armed forces should be made by army. আমার চিন্তা ছিল, কনভেনশনাল আর্মির পাশাপাশি গোটা জাতিকে সামরিক শিক্ষায় প্রশিক্ষিত করতে না পারলে দেশের প্রতিরক্ষা সুদৃঢ় হবে না। এ জন্য আর্মিকে দেশের জনগণকে সামরিক প্রশিক্ষণ দেয়ার কাজে লাগাতে হবে। এই চিন্তাটি আমি আমার এক বইয়ে লিখেছি। জিয়াউর রহমান আমার এই চিন্তাকে সমর্থন করেছিলেন। তবে তিনি প্রথমে ছাত্রদের সামরিক প্রশিক্ষণ দেয়ার কথা চিন্তা করেছিলেন। এ জন্য তিনি বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (বিএনসিসি) গঠন করেছিলেন।

জিয়াউর রহমানের বিশেষ কৃতিত্ব ছিল বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ধারণা প্রবর্তনে। তিনি বুঝেছিলেন, বাংলাদেশ শুধু জাতিগত ‘বাঙালি’ পরিচয়ে পরিচিত হবে না, একই সঙ্গে মুসলমানসহ অন্য ধর্মের পরিচয়ও রয়েছে। এসব পরিচয়কে একত্রিত করতে হবে। তিনি যে রাজনৈতিক দল বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন, তার মুলে ছিল এই বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ।

একজন রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে জিয়াউর রহমান সব সময় অন্যের চসমষয় সফ ংমপা বোঝার চেষ্টা করতেন। এ জন্য তিনি বিভিন্ন দলের লোকের সঙ্গে আলোচনা করতেন। তিনি খুবই সহনশীল ব্যক্তি ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন প্রতিভাবান সংগঠক। তিনি সেনাবাহিনী ও একটি রাজনৈতিক দল সংগঠিত করেছিলেন। তিনি যে ১৯ দফা কর্মসুচি প্রণয়ন করেছিলেন, তার যৌক্তিকতা আজো সমানভাবে রয়ে গেছে। এই ১৯ দফার মধ্য দিয়ে তিনি তার রাজনৈতিক দর্শন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও তিনি সফলতা দেখিয়েছিলেন। জিয়াউর রহমান বাংলাদেশকে একটি শক্তিশালী স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। তিনি দেশকে ভারতের আধিপত্য থেকে মুক্ত করার জন্য মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক যেন সৌহার্দøমুলক হয় তার জন্য চেষ্টা করেছেন। বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে তিনি এমন একটি ধারা অনুসরণ করতেন, যার মুল কথাই ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব অটুট রাখা।

তিনি যে আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্হা গঠনের চিন্তা করেছিলেন, তার মুলেও বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব অটুট রাখার চিন্তাই ছিল। তিনি সার্কের স্বপ্নদ্রষ্টা। জিয়াউল হকের সময়কার পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আগা শাহীর সঙ্গে কাঠমান্ডুতে আমার একবার দেখা হয়েছিল। তিনি সার্কের ব্যাপারে বলেছিলেন, ‘আমরা যখন সার্কের কথা শুনি, তখন মনে হয়েছিল, জিয়াউর রহমান কি ভারতের দালাল? তারপর দেখলাম, না, তিনি সত্যিকার অর্থেই চাচ্ছেন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়াতে।’ আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্হা সার্কের যে ধারণা তা জিয়াউর রহমানের নিজের। এ ধারণার বীজ উপ্ত করে তিনি দুরদৃষ্টির পরিচয় দিয়েছিলেন।

জনগণের প্রতি জিয়াউর রহমানের কমিটমেন্ট ছিল। এই কমিটমেন্ট থেকেই তিনি মাইলের পর মাইল হাঁটতে পারতেন। সে সময় অনেক সিভিল সার্ভেন্টের সঙ্গে আমার আলাপ হতো। তারা বলতেন, ‘লোকটি পাগল নাকি, মাইলের পর মাইল হাঁটেন কীভাবে।’ অবশ্য পরে তারা তার আন্তরিকতা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন।
জিয়াউর রহমানের শাসনামল ছিল মাত্র সাড়ে ৩ বছরের। এই অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি বাংলাদেশকে একটি ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছিলেন। তার শাসনামল ছিল সবদিক দিয়েই উল্লেখযোগ্য। এ সময়ের মধ্যে তিনি রাজনীতির দ্বার উন্মুক্ত করেন। তার অব্যবহিত আগে রাজনীতির যে বন্ধ্যাত্ব ছিল তা কাটিয়ে ওঠার জন্য বহুদলীয় গণতন্ত্রের ভিত্তি স্হাপন করেন। গণতন্ত্রের প্রাণ রাজনৈতিক দলগুলো তার আমলেই জীবন লাভ করে। একই সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক উন্নতিও ঘটে। এ সময় অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নয়ন হয়েছে।

আমার সঙ্গে তার মাঝে মাঝে আলাপ হতো। কথাবার্তায় তিনি ছিলেন ইন্টেলিজেন্ট। পোশাকে-আশাকে ছিলেন কেতাদুরস্ত। তিনি ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। সব কিছু নিয়ে ছিল তার সমান আগ্রহ।

শুধু তাই নয়, ভালো, মেধাবী এবং উদ্যমী লোকদের তার পার্টিতে জড়ো করতে পেরেছিলেন। মফস্বলের একজন উকিলের সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল। তিনি ভালো মানুষ, পাশাপাশি ভালো সংগঠকও। তিনি বিএনপির একজন নেতা। তাকে একদিন জিজ্ঞেস করলাম, রাজনীতিতে তিনি কীভাবে সম্পৃক্ত হলেন? তিনি বললেন, ‘আমাদের মহকুমার এসডিও সাহেব একদিন ডেকে বললেন, রাষ্ট্রপতি সাহেব আপনাদের মতো লোকদের খুঁজছেন। জিয়াউর রহমানের সঙ্গে আলাপ হলো। ভালো লাগল। তারপর দলে যোগ দিলাম।’

তখনকার পিজি হাসপাতালের (বর্তমানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়) এক চিকিৎসকের সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল। এখন তিনি আর দেশে নেই। অনেকদিন আগে বিদেশ চলে গেছেন। তিনি প্রসঙ্গক্রমে একদিন বললেন, ‘হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছি। আমার সামনে দিয়ে রাষ্ট্রপতির গাড়ির বহর যাচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ আমার সামনে এসে গাড়ির বহর থেমে যায়। গাড়ি থেকে নামলেন যিনি, দেখলাম তিনি রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তিনি বললেন, ‘গাড়িতে উঠুন।’ আমি দ্বিরুক্তি করিনি। একেবারে সোজা বঙ্গভবনে। নেমে জিজ্ঞেস করলেন, কবি কাজী নজরুল ইসলামের চিকিৎসার বিষয়ে। ড. বিকে পন্নী নামে একজন হোমিও চিকিৎসক আছেন। এখন তার অফিস বনানীতে। তাকেও কবি নজরুলের চিকিৎসা করতে বলেছিলেন জিয়াউর রহমান। ডাক্তার একদিন আমাকে বলেছিলেন, হোমিও চিকিৎসায় নজরুলের বেশ উন্নতিও হয়েছিল।

অনুলিখনঃ মাহাবুবুর রহমান

The Daily Amardesh
19 January 2009

বিপ্লব দিবস ও শহীদ জিয়া

বাংলাদেশের রাজনীতির গতিধারা স্বতন্ত্র। স্বতন্ত্র এখানকার মানুষের প্রকৃতি। বৈশিষ্ট্যপূর্ণ প্রকৃতির গতি প্রবাহ। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এখানকার প্রকৃতিও রূপ পরিবর্তন করে। প্রকৃতি বিরূপ হলে মানুষ মনোবল হারায় না। ঝড়ের অবিনাশী তাণ্ডব কিংবা জলোচ্ছ্বাসের করালগ্রাসেও দুর্গতরা আবার আশার বুক বাঁধে। ধ্বংসস্তুূপের ওপর দাঁড়ায় মাথা উঁচু করে। নিপীড়ন ও নির্যাতনে হয়ে ওঠে প্রতিবাদী। স্বাধীনচেতা এখানকার মানুষ। আত্মনির্ভর ও স্বাধীন থাকাটাই এ জনপদের মানুষের হাজার বছরের ইতিহাস। বাংলাদেশের রাজনীতি আত্মনির্ভরশীলতার, পরাধীনতার নয়। সীমাহীন বঞ্চনা ও দরিদ্রতার কষাঘাতেও বাংলাদেশের মানুষ পরাধীন ও দাসত্বকে স্বীকার করে না।

বাংলাদেশের রাজনীতির এই অভিব্যক্তির কথা সকলের স্মরণে আছে। স্মরণে আছে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এবং ব্রিটিশ বিতাড়নে আন্দোলনকারী বীর যোদ্ধাদের কথা। সাতই নভেম্বরের বিপ্লব আরেকবার সে কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। এই বিপ্লব দেশপ্রেমিক সিপাহী-জনতার সম্মিলিত প্রয়াস। এ বিপ্লব ছিল জাগ্রত চেতনার। পরাধীনতার বিরুদ্ধে স্বাধীনতার এবং দেশের সার্বভৌম রক্ষার এক দীপ্ত প্রেরণার। পরাস্ত করা হয় সকল ষড়যন্ত্র। সাতই নভেম্বর সেই থেকে ঐতিহাসিক বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে বাংলাদেশের ইতিহাসে গৌরবোজ্জ্বল হয়ে আছে। সাতই নভেম্বরের পর থেকেই সূচিত হয় রাজনীতির নতুন গতিধারা। বাংলাদেশের রাজনীতির প্রকৃতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে স্বীয় কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে। এক কথায় সাতই নভেম্বরের পরে থেকে বাংলাদেশের বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গির মৌলিক পরিবর্তন ঘটে।

বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে দু’টি দিন সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল। এ দিন দু’টি সম্পর্কে অবশ্যই সকলের কম-বেশি সম্যক ধারণা আছে। সাতই নভেম্বর একটি অন্যতম দিন। অপরটি ২৬ মার্চ। এ দুটি দিন জাতির এক সময় ক্রান্তিকাল ছিল। আর তাই এ ক্রান্তিকালে একজন বীর সেনানীর নাম নিবিড়ভাবে জড়িত। তিনি হলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। ২৬ মার্চ ’৭১-এ জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। তিনি শুধু স্বাধীনতার ঘোষকই ছিলেন না; তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাও ছিলেন।

স্বাধীনতা-উত্তরকালে জেনারেল জিয়ার খ্যাতি বিস্তার লাভ করে। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে তাঁর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেতে থাকে। বিশেষ করে সৈনিকদের মাঝে তাঁর সুনাম ও মর্যাদা ছিল ঈর্ষনীয়। কারণ এ দেশের মাটিও তাঁর মানুষের প্রতি ছিল তাঁর গভীর মমত্ববোধ। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তাঁর ভূমিকা ছিল অতন্দ্র প্রহরীর মতো। এটাই কালক্রমে বিরূপ হয়ে দাঁড়ায়। অবশেষে তিনি ষড়যন্ত্রের শিকার হন।

বাংলাদেশে রাজনীতিতে ষড়যন্ত্র- এটা যুগে যুগেই ছিল। নবাব সিরাজ উদ্দৌলার বিরুদ্ধে মীর জাফরের ষড়যন্ত্র যুগান্তকারী ঘটনা। ১৯৭৫ খৃস্টাব্দের ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থান একটি পূর্ব-পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ ছিলেন এর মূল নায়ক। সেদিনকার অভ্যুত্থানে জনপ্রিয় জিয়াউর রহমানকে বন্দী করে রাখা সম্ভব হয়নি।

সাতই নভেম্বরের ঐতিহাসিক অভ্যুত্থান এর সফল অভ্যুত্থান। এ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে এক নতুন সূর্যোদয় হয়েছিল। ব্যবধান ছিল মাত্র চার দিন। ৩ নভেম্বর ১৯৭৫ খৃস্টাব্দে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে আংশিক সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে। ছলে-বলে কৌশলে তিনি দখল করে ফেলেন রাষ্ট্রক্ষমতা। জনগণ বুঝতে পারে এ অভ্যুত্থান জনস্বার্থে, সার্বভৌম ও স্বাধীনতা-বিরোধী। বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয় ভারতের বেতার থেকে খালেদ মোশাররফকে স্বাগত জানানোর মাধ্যমে। জনতা হতবাক হয়ে পড়ে ৪ নভেম্বর খালেদ মোশাররফের ভাই আওয়ামী লীগ নেতা রাশেদ মোশাররফ ও তাঁর নেতৃত্বে রাজপথে মিছিল দেখে। জাগ্রত-জনতার চেতনার অনুভূতিতে আঘাত হানল ঘটনপ্রবাহ। দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌম রক্ষার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে গড়ে উঠল জাতীয় ঐক্য। দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী তাতে উদ্বুদ্ধ হল। সকলের একই কণ্ঠ( দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব আজ আবার বিপন্ন হতে চলেছে। আমাদের জাতীয় চেতনা ও অস্তিত্ব এক বিপর্যয়ের মুখোমুখি। এহেন অবস্থা কোনক্রমেই মেনে নেয়া যায় না। দেশদরদী সিপাহী-জনতার সংহতি এ সময়ের সাহসী পদক্ষেপ। এক অমিত শক্তিতে জাতি রুখে দাঁড়াল। স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে দেশপ্রেমিক সিপাহীরা বেছে নিল নেতৃত্ব দেয়ার জন্য স্বাধীনতার ঐতিহাসিক ঘোষক জিয়াউর রহমানকে। খালেদ মোশাররফের শিকল চূর্ণ করে বীরদর্পে মুক্ত করা হল জিয়াউর রহমানকে। সফল অভ্যুত্থানের মাধ্যমে খর্ব হল খালেদ মোশাররফের পরিকল্পিত সকল ষড়যন্ত্র। বন্দী জিয়া এখন মুক্ত। তিনি এখন সিপাহী-জনতার কাতারে। জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে তিনিও একাকার হয়ে গেলেন। উন্মুখ জনতা তাঁকে গ্রহণ করে নিল কর্ণধার হিসেবে। সাতই নভেম্বর উৎকণ্ঠিত জাতি আবার শুনতে পেল সেই উদাত্ত কণ্ঠস্বর( “প্রিয় দেশবাসী! আসসালামু আলাইকুম। আমি মেজর জিয়া বলছি।” ৭১-এর ২৬ মার্চ জাতি এ কণ্ঠেই শুনেছিল স্বাধীনতার ঘোষণা।

সাতই নভেম্বরের সিপাহী-জনতার স্বতঃস্ফূর্ত অভ্যুত্থান ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরল ঘটনা। বিজয় মিছিলে সিপাহীরা ট্যাংক ব্যবহার করে। উৎফুল্ল জনতা ট্যাংকে ফুলের মালা পরিয়ে ট্যাংকে উঠে নেচে-গেয়ে আনন্দ-উল্লাস করে। সেদিন সমম্বরে ্লোগান দেয়া হয়( “নারায়ে তাকবীর-আল্লাহু আকবার, বাংলাদেশ-জিন্দাবাদ।” সেদিনকার উচ্ছ্বসিত আনন্দ শহর, বন্দর, গ্রামে-গঞ্জে ছড়িয়ে পড়ে। সে এক অভূতপূর্ব আনন্দ।

সাতই নভেম্বরের ঘটনাক্রম নিঃসন্দেহে বিপ্লবাত্মক। তার প্রমাণ পাওয়া যায় বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক এমনকি তাহজিব-তমদ্দুনের দিকে দৃষ্টিপাত করলে। সাতই নভেম্বরের পূর্বেকার বাংলাদেশ সাতই নভেম্বরের পর থেকে স্বতন্ত্র হয়ে ওঠে। এই স্বতন্ত্র সুস্পষ্ট হয় অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে। সুস্পষ্ট হয় আন্তর্জাতিক পর্যায়েও। সাতই নভেম্বরের পূর্বে বাংলাদেশে একদলীয় শাসন-শোষণের যে দোর্দাণ্ড প্রতাপ ছিল তার অবসান ঘটে। পর্যায়ক্রমে রাজনীতি হয়ে ওঠে বিকশিত। সকল দল মতের লোক স্বতন্ত্রভাবে স্ব স্ব মতার্দশ প্রচার প্রসারের সুযোগ পায়। কণ্ঠরুদ্ধ সংবাদপত্রের সংখ্যা যেমন বিস্তার লাভ করে তেমনি মুখে ফোটে নানান কথা। পায় অবারিত স্বাধীনতা। সংকীর্ণ বাঙালি জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে সামাজি পর্যায়ে বৃহৎ পরিধিতে পরিশীলিত হয় বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ। ধর্ম-নিরপেক্ষতার জায়গায় এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসাধারণের বোধ-বিশ্বাসের বাণী উচ্চারিত হয় সংবিধানে- ‘সর্বশক্তিমান মহান আল্লাহ নামে আরম্ভ করছি।’ সংবিধান থেকে বিদায় ঘটে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির। একদলীয় শাসনের পরিবর্তন ঘটে। প্রতিষ্ঠিত হয় বহুদলীয় গণতন্ত্র।

সাতই নভেম্বরের পর থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের ভাব-মর্যাদা উচ্চাসীন হয়। ইঙ্গ-সোভিয়েত বলয় থেকে বের হয়ে বাংলাদেশ বিশ্বের সর্বত্র আলাদা মর্যাদা লাভ করে। আঞ্চলিক পর্যায়েও বাংলাদেশের অবস্থান খুবই শক্ত। দক্ষিণ-এশিয়ার সহযোগিতা সংস্থা ‘সার্ক’-এর রূপকার বাংলাদেশ। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীতে বাংলাদেশের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

জনকল্যাণের লক্ষ্যে যারা সমাজ পরিবর্তনের উদ্যোগী, জাতীয় স্বার্থ সমুন্নত রাখতে আগ্রহী, তাদের কাছে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস নতুন করে উৎসাহ যোগাবে।


-সরকার রফিক