বিশ্ব রাজনীতিতে রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমান । অধ্যাপক মুহম্মদ শামস-উল হক

মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা এবং জাতীয় সংসদ, বিশেষ করে সংসদের পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটির মুল্যবান পরামর্শ। এ প্রসঙ্গে, বিশেষ করে জাতীয় ঐকমত্য নির্ধারণে বিরোধী দলের নেতৃবর্গের গঠনমুলক ভুমিকাও উল্লেখযোগ্য।

জাতীয় লক্ষ্য অর্জনে অভ্যন্তরীণ নীতির সম্পুরক হিসেবে পররাষ্ট্র নীতিকে সার্থক এবং কার্যকর ভুমিকা পালন করতে হলে আন্তঃরাষ্ট্র, আঞ্চলিক এবং বিশ্ব রাজনীতির পর্যায়ে ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক শক্তিগুলোর জটিল এবং পরিবর্তনশীল প্রক্রিয়া সম্পর্কে যথোপযুক্ত জ্ঞান এবং সে জ্ঞানের ক্রম নবায়ন অপরিহার্য।

এদিক থেকে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্হাপন করেন। কর্মব্যস্ততা সত্ত্বেও তার পড়ার ও জানার স্বভাবসুলভ আগ্রহ এত বেশি ছিল যে, তিনি বহিঃসম্পর্ক উন্নয়নে পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে সব দলিল, কর্মপত্র এবং সম্পৃক্ত পুস্তকাদি একান্ত যত্মের সঙ্গে পড়তেন এবং মাঝে মাঝেই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এসে একটি দীর্ঘমেয়াদি, কার্যকর, উন্নয়নমুখী, গতিশীল পররাষ্ট্রনীতি রচনা ও বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় কলাকৌশল নিয়ে বিশ্লেষণভিত্তিক আলোচনা করতেন।

এ ধরনের আলোচনাকালে তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, মুক্ত এবং বস্তুনিষ্ঠ দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের চমৎকৃত করে এবং বাংলাদেশের বৈদেশিক সম্পর্কের সার্বিক বিকাশে অতি মুল্যবান পুঁজি হিসেবে কাজ করে। ফলে রাষ্ট্রপ্রধান এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে যে পারস্পরিক আস্হা, সমঝোতা ও সহযোগিতার মনোভাব গড়ে ওঠে, তা বৈদেশিক সম্পর্কের উন্নয়নে কর্মরত সবাইকে নতুন প্রেরণায় উজ্জীবিত করে।

অতি এক নাজুক অবস্হা থেকে বাংলাদেশকে ধাপে ধাপে অগ্রসর হতে হয়েছে এবং এই অগ্রগতির পথে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দুরদৃষ্টি, অসীম ধৈর্য, কুটনৈতিক অন্তদৃêষ্টি এবং আপসের মনোভাব মুল্যবান অবদান রাখে। তার প্রথম উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত দেখতে পাই ১৯৭৭ সালে এপ্রিল মাসের শেষ সপ্তাহে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র দশদিন পরই জোট নিরপেক্ষ ব্যুরোর মন্ত্রী পর্যায়ের অধিবেশনে যোগদানের জন্য আমাকে নতুন দিল্লি যেতে হয়। ৫ এপ্রিল বিকালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মুরারজি দেশাই’র সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতের জন্য ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী পার্লামেন্ট ভবনে তার অফিস কক্ষে আমাকে নিয়ে যান। হৃদ্য পরিবেশে অনুষ্ঠিত এ সাক্ষাৎকালে দুই প্রতিবেশী দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক উন্নয়নের লক্ষ্যে একটি অতি গুরুত্বপুর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। গঙ্গা নদীর পানি-বণ্টন নিয়ে দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে যে তিক্ততার সৃষ্টি হয়েছে তার আশু অবসানকল্পে আলোচনার জন্য ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জগজীবন রাম এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে ঢাকায় আসবেন। এই সিদ্ধান্ত মতো জগজীবন রাম ঢাকায় এসে ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা শুরু করেন। দীর্ঘ আলোচনার পর ফলপ্রসু অগ্রগতি না হওয়ায় জগজীবন রাম রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন ত্যাগ করে বিমানবন্দরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন জানতে পেরে আমরা স্বভাবতই সবাই উদ্বিগ্ন হই। এই আলোচনা আয়োজনে গৃহীত উদ্যোগের সঙ্গে জড়িত থাকায় ব্যক্তিগতভাবে আমি বিশেষ বিব্রত বোধ করি। অনেকটা পীড়াপীড়ি করেই জেনারেল জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তার সচিবালয় অফিসে এক সৌজন্য সাক্ষাতের জন্য ভারতের মন্ত্রী জগজীবন রামকে আনা হয়। তখন দুপুর পার হয়ে গেছে। বিমানবন্দরে জগজীবন রামের বিমান রওনা হওয়ার জন্য প্রস্তুত। এ সৌজন্য সাক্ষাৎ বেশিক্ষণ স্হায়ী হবে বা জগজীবন রাম তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করবেন, ওই পরিস্হিতিতে অপ্রত্যাশিতই ছিল। কুটনীতিতে পেশাগত দক্ষতা বা অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও জেনারেল জিয়াউর রহমান তার ভদ্র, নম্র ও বন্ধুসুলভ আচরণের মাধ্যমে এমন এক পরিবেশের সৃষ্টি করেন যে, এই প্রবীণ রাজনীতিবিদকে প্রায় তিন ঘণ্টাকাল আলোচনায় ব্যস্ত রাখতে সমর্থ হন। সমস্যাটির বস্তুনিষ্ঠ যুক্তি-নির্ভর বিশ্লেষণের ফলে এর সমাধানে মৌল নীতিমালা (ঋড়ৎসঁষধ) উদ্ভাবনে তারা মতৈক্যে উপনীত হন। এ মতৈক্যই ছিল ওই বছরের ৫ নভেম্বরে স্বাক্ষরিত ৫-সালা চুক্তির বুনিয়াদ এবং দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মধ্যে সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক উন্নয়নের পথে এক গুরুত্বপুর্ণ পদক্ষেপ।

স্বাধীনতা যুদ্ধে জিয়াউর রহমানের ঐতিহাসিক ভুমিকা সুবিদিত। কিন্তু এ ভুমিকা পালনে কী ভয়ানক মানবিক যন্ত্রণা তাকে ভোগ করতে হয়, তা প্রথম জানতে পাই তার সঙ্গে রেঙ্গুন সফরকালে। সফরের শেষ পর্যায়ে প্রেসিডেন্ট নে উইনের নৈশভোজের পর রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবনে আমরা ফিরে এসেছি। আমি রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তার ঘর পর্যন্ত যেতেই আমাকে তিনি বসতে অনুরোধ করলেন। উদ্দেশ্য, প্রতিবেশী ব্রহ্মদেশে এই প্রথম সফরের একটি বস্তুনিষ্ঠ মুল্যায়ন। দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কের উন্নয়নে সম্ভাবনা এবং নে উইনের সঙ্গে ব্যক্তিগত পর্যায়ে তার যে আদান-প্রদান হয় তার প্রেক্ষিতে এ সম্পর্ককে কীভাবে আরো অর্থবহ করা যায়, তাকে কেন্দ্র করে বেশ বিস্তৃত আলোচনা হয়।

এ আলোচনাকালে হঠাৎ এক সময় টেলিফোন বেজে উঠল। আমি ধরলাম। তখন রাত প্রায় এগারটা। বর্মায় উপস্হিত আমাদের রাষ্ট্রদুত জানালেন যে, বর্মার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক তাকে জানিয়েছেন কোনোরুপ যুক্তবিবৃতি দেয়ার রেওয়াজ তাদের নেই। কাজেই যুক্ত-বিবৃতি স্বাক্ষরিত হবে না। আমাদের রাষ্ট্রদুত যখন ঢাকায় আসেন, তখনই তাকে এরুপ বিবৃতির একটি খসড়া দেয়া হয়, যেন তিনি যথাসময়ে এবং সফর শেষের আগেই তার প্রতিপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে এবং প্রয়োজনবোধে আমাদের সঙ্গেও আলোচনা করে এ বিবৃতিকে চুড়ান্ত করা হয়। শেষ মুহুর্তে এরুপ হবে তা কেউ আশা করেনি। নৈশভোজের আগেই এ সম্পর্কে জানতে পারলে প্রেসিডেন্ট নে উইনকে বলা যেত। পরের দিন সকালেই রেঙ্গুন বিমানবন্দর ত্যাগ করে ঢাকায় প্রত্যাবর্তন করতে হবে। এই স্বল্পসময়ে প্রেসিডেন্ট নে উইনের হস্তক্ষেপ ছাড়া যুক্তবিবৃতি প্রকাশের কোনো সম্ভাবনাই ছিল না। কাজেই প্রেসিডেন্ট নে উইনের বাসভবনে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান টেলিফোন করেন, কিন্তু সেখানে তাকে পাওয়া গেল না এবং কোথায় পাওয়া যাবে তাও কেউ বলতে পারল না। এ অবস্হায় স্হির হলো পরের দিন প্রত্যুষেই তাকে টেলিফোন করা হবে। স্বভাবতই এই পরিস্হিতিতে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বিরক্ত হলেন, কিন্তু ঠিক বিচলিত হলেন না। মনে হলো, এই অপ্রত্যাশিত অবস্হায় তার মনে যে অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে, তাকে আয়ত্তাধীনে আনতে চেষ্টা করছেন।

এ জন্যই বোধ হয় আমাকে অনুরোধ করলেন যদি খুব পরিশ্রান্ত না হয়ে থাকি, আরো কিছুক্ষণ বসতে। স্বাধীনতা যুদ্ধসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ চলল প্রায় রাত ১২টা পর্যন্ত। তার ব্যক্তিগত জীবনের কিছু কিছু কথা এই প্রথমবারের মতো আমাকে বললেন এবং তার মুখমন্ডলে দেখতে পেলাম এক প্রশান্তি ও আত্মবিশ্বাসের ছাপ। এই প্রথম জানতে পারলাম যে সমগ্র ন’মাস যুদ্ধকালে তার স্ত্রী এবং দুই ছেলে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে দুঃসহ বন্দি জীবন যাপন করেন এবং তাদের নিরাপত্তা বিপন্ন জেনে স্বামী এবং পিতা হিসেবে তার মানসিক যন্ত্রণা সহজেই অনুমেয়। কিন্তু বার বার প্রতিপক্ষ ভীতি প্রদর্শন করে চিঠি লিখে এ যন্ত্রণাকে আরো তীব্রতর করে। এ মানসিক যন্ত্রণা নিয়েই যুদ্ধে জয়যুক্ত না হওয়া পর্যন্ত একজন সেনানায়ক হিসেবে তার দায়িত্ব পালনে তিনি অবিচল থাকেন। তার জীবনের এ ঘটনা আমার মনকে গভীরভাবে স্পর্শ করে এবং স্বাধীনতা যুদ্ধে তার নির্ভীক এবং আত্মনিবেদিত ভুমিকা নতুন আলোকে দেখতে পাওয়ার সুযোগ হয়। সেদিন আরো জানলাম যে, তার জীবনের আকাঙ্ক্ষা ছিল অর্থনীতিতে গবেষণা করে শিক্ষকতা করা। শিক্ষকের প্রতি তার স্বভাবসুলভ সৌজন্য ও শ্রদ্ধাশীলতার এটাই বোধহয় একটি কারণ ছিল। পরের দিন প্রত্যুষে প্রেসিডেন্ট নে উইনকে টেলিফোনে অনুরোধ করার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি যুক্তবিবৃতি প্রকাশে সম্মত হয়ে এ জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।

কঠিন সমস্যা এবং সঙ্কটের মুখে বিচলিত না হওয়া তার একটা চারিত্রিক গুণ ছিল। এর বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে। এ প্রসঙ্গে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ১৯৭৯ সালে তেহরানে মার্কিন দুতাবাসের কর্মকর্তাদের দুতাবাসে বন্দি করা হতে উদ্ভুত সঙ্কট। কুটনৈতিক কর্মকর্তা আটক করা জেনেভা কনভেনশন এবং প্রচলিত আন্তর্জাতিক রীতিনীতির পরিপন্হী[ &ৗ২৫০৯; ]। এ সময় নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ এ সঙ্কটের আশু সমাধানের জন্য পরিষদের ভেতরে ও বাইরে সক্রিয় ভুমিকা পালন করে। ইরান নিরাপত্তা পরিষদের সুপারিশ সত্ত্বেও এদের মুক্তি দিতে অনিচ্ছা প্রকাশ করায় মার্কিন সরকার ইরানের বিরুদ্ধে ঢ়থষধয়মসষঢ় আরোপের জন্য একটি প্রস্তাব নিরাপত্তা পরিষদের স্হায়ী সদস্যদের সঙ্গে পরামর্শ করে পেশ করে। এই প্রস্তাব বিবেচনার প্রাক্কালে প্রেসিডেন্ট কার্টার রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে টেলিফোন করে বাংলাদেশের সমর্থনের জন্যে বিশেষভাবে অনুরোধ করেন। তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সর্বাধিক সাহায্যদাতা এবং ১৯৭৯ সালে দেশের এক বিস্তৃত অংশ বন্যাকবলিত হওয়ার ফলে পিএল ৪৮০-এর অধীনে যুক্তরাষ্ট্র হতে খাদ্য-সাহায্যের প্রয়োজনীয়তাও ছিল বিশেষ গুরুত্বপুর্ণ। আমাদের দুতাবাস থেকে প্রাপ্ত সংবাদ অনুযায়ী ইরানের আচরণে সমগ্র যুক্তরাষ্ট্রে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের সৃষ্টির প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সমর্থনের ওপর বাংলাদেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ সাহায্য নির্ভর করবে। কাজেই জাতীয় স্বার্থের দিক থেকে ইরান-মার্কিন সমস্যা এক বিরাট হুমকির রুপ পরিগ্রহ করে।

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান প্রেসিডেন্ট কার্টারকে সৌজন্যের সঙ্গে জানান, মন্ত্রিসভার সঙ্গে পরামর্শের পর আবার তার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিশ্রুতি না দিয়ে তিনি যে রাজনৈতিক বিচক্ষণতা প্রদর্শন করেন, পরবর্তী ঘটনাবলী হতে তা সুস্পষ্ট হয়। নিরাপত্তা পরিষদে বাংলাদেশ প্রধানত জোট নিরপেক্ষ ও তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর ভোটে নির্বাচিত হয়। এসব রাষ্ট্রের, বিশেষ করে এশিয়ার প্রধান মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর মত যাচাই করে এ সিদ্ধান্তে আসা হয় যে, ঢ়থষধয়মসষঢ় জিম্মিদের মুক্তিতে ফলপ্রসু না হয়ে সম্পুর্ণ বিরুপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করার আশঙ্কাই বেশি, বিশেষত ইরানে তখন বিরাজমান নাজুক পরিস্হিতি। এই বিশ্লেষণের আলোকে ঢাকাস্হ মার্কিন রাষ্ট্রদুতের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এ বিষয়ে মতের আদান-প্রদান সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র তার সিদ্ধান্তে অনড় থাকে। নিরাপত্তা পরিষদে বিষয়টি বিবেচনার সময় বাংলাদেশের কী বক্তব্য হবে, তার একটি খসড়া মন্ত্রিসভায় উপস্হাপন করা হয়। সুদীর্ঘ আলোচনার পর মন্ত্রিসভা এ বক্তব্য অনুমোদন করে। বাংলাদেশের স্হায়ী প্রতিনিধি নিরাপত্তা পরিষদের অধিবেশনে এ বক্তব্য পেশ করেন এবং ভোট দান থেকে বিরত থাকেন। বাংলাদেশ যে নীতি গ্রহণ করে তার যৌক্তিকতা পরবর্তী ঘটনাবলী হতে সুপ্রমাণিত হয়।

১৯৮০ সালের জুন মাসে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তেল সঙ্কটের ওপর জাতিসংঘের বিশেষ অধিবেশনে তার যুক্তিনির্ভর এবং দলমত নির্বিশেষে সবার প্রশংসিত ভাষণ প্রদানের পর প্রেসিডেন্ট কার্টারের আমন্ত্রণে তার সঙ্গে এক সাক্ষাতে মিলিত হন। এ সাক্ষাৎ ছিল খুবই হৃদ্যতাপুর্ণ। আলোচনা শেষে প্রচলিত রীতি অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট কার্টার রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানসহ ডভময়প ঐসৎঢ়প জসঢ়প এথড়নপষ-এ সংবাদ মাধ্যম প্রতিনিধিদের সামনে উপস্হিত হন এবং রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বের প্রশংসাসুচক বক্তব্যে তাকে একজন বিজ্ঞ রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে উল্লেখ করেন। জিম্মি সঙ্কটের পটভুমিতে এ প্রশংসা স্বভাবতই আমাদের সবাইকে চমৎকৃত করে।
আলোচনায় প্রতিপক্ষের আস্হা অর্জনে তার প্রধান হাতিয়ার ছিল তার সৌজন্য, বন্ধুসুলভ আচরণ এবং পুর্বপ্রস্তুতিভিত্তিক যুক্তি-নির্ভর বিশ্লেষণের ক্ষমতা। এর একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ছিল ইসলামিক শান্তি কমিটির পক্ষে ইরান ও ইরাকের সঙ্গে আলোচনার জন্য কমিটির একক প্রতিনিধি হিসেবে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নির্বাচন। ১৯৮১ সালের এপ্রিল মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে সংগঠিত এই একক মিশনের প্রচেষ্টা অপ্রত্যাশিতভাবে ফলপ্রসু হয়, কারণ ইরান ও ইরাকের রাষ্ট্রপ্রধানরা যুদ্ধ অবসানের জন্য প্রয়োজনীয় শর্তগুলো সম্পর্কে প্রথমবারের মতো ঐকমত্যে উপনীত হন এবং এসব শর্ত বাস্তবায়নের জন্য যুদ্ধবিরতি কমিশনসহ অন্যান্য ৩টি কমিশনে কারা সদস্য হবে, সে সম্পর্কেও উভয় রাষ্ট্রপ্রধান সম্মত হন। দুর্ভাগ্য যে, এ সর্বসম্মত শান্তিপ্রস্তাব বাস্তবায়নের আগেই রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শহীদ হন এবং প্রেসিডেন্ট বনি সদরকে দেশ ছেড়ে চলে যেতে হয়।

বাংলাদেশের বহিঃসম্পর্ক উন্নয়নে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের বহুমুখী অবদানের কথা বলতে গেলে অনেক ঘটনাই স্মৃতির কোঠায় ভিড় করে। বর্তমান প্রবন্ধের সংক্ষিপ্ত পরিসরে তার বর্ণনা সম্ভব নয়। তবে দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক সহযোগিতা প্রতিষ্ঠার জন্য তার ঐতিহাসিক অবদান সম্পর্কে কিছু না বললে বর্তমান অসম্পুর্ণ থেকে যাবে। আগেই উল্লেখিত হয়েছে যে, তার কর্মব্যস্ততা সত্ত্বেও দ্বিপাক্ষিক, আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষণ ও বস্তুনিষ্ঠ আলোচনায় তার আগ্রহ ছিল সীমাহীন। তিনি ছিলেন এক মুক্ত ও সৃজনশীল মনের অধিকারী। তিনি উপলব্ধি করতে পারেন যে, দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে বিরাজমান প্রতিকুল রাজনৈতিক পরিবেশকে পরিবর্তন করে আঞ্চলিক শান্তি ও স্হিতিশীলতা জাতীয় উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য। নিঃসন্দেহে এরুপ সহযোগিতার পথে বিরাজমান প্রধান প্রতিবন্ধকটি মানসিক এবং ঐতিহাসিক স্মৃতির গভীরে গ্রোথিত। তবে আমাদের বিশ্লেষণ হতে প্রতীয়মান হয় যে, এসব প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করা সম্ভব এবং জাতীয় স্বার্থেই সে প্রচেষ্টা গ্রহণ বাঞ্ছনীয়। এ লক্ষ্যে রাষ্ট্রপতি জিয়া নিজেকে সম্পুর্ণভাবে নিবেদিত করেন এবং ১৯৭৭ সাল হতে পরিচালিত তার নিরলস চেষ্টার ফসল ‘সার্ক’।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতির রচনায় ও বিকাশে তার প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেয়ে আমি সম্মানিত বোধ করি। এই দীর্ঘ সময়ে এবং তার রাজনৈতিক দলের সদস্য না হওয়া সত্ত্বেও তিনি আমার প্রতি সতত যে সৌজন্য, হৃদ্যতা ও আস্হা প্রদর্শন করেছেন, তা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করি এবং আবারো তার পবিত্র স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করি।

লেখকঃ মরহুম, জাতীয় অধ্যাপক ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী

The Daily Amardesh
19 January 2009

No comments: