বিশ্বব্যাপী আজ যখন নারীর ক্ষমতায়নের স্লোগান উঠেছে, তখন বাংলা মায়ের অমর সন্তান জাগরনের পথিকৃৎ শহীদ জিয়াকে মনে পড়ে। আজ থেকে ২৬ বছর আগে শহীদ জিয়া নারীর ক্ষমতায়নের স্বপ্ন দেখেছিলেন এবং রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন। জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। তাই দেশের বা সমাজে সামগ্রিক উন্নয়নের পূর্বশর্ত নারীর ক্ষমতায়ন। কারণ অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে নিস্ক্রিয় রেখে কখনই সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। এ সত্য শহীদ জিয়া সঠিকভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। তাইতো তিনি সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে নারী সমাজকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছিলেন। নারীর ক্ষমতায়ন এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে নারী তার নিজের অবস্থান বা আপেক্ষিক সামাজিক মর্যাদা সম্পর্কে সজাগ হবে, বিরাজমান সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থানগত বৈষম্য সম্পর্কে সচেতন হবে এবং সর্বোপরি আপন শক্তিমাত্রা অর্জনের জন্য সক্রিয় ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে সকল বৈষম্য দূরীকরণ তথা নারী-পুরুষ সমতার লক্ষ্য অর্জনে সমর্থ হবে। শহীদ জিয়া যথার্থই উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন, যে, নারী সমাজকে সঠিক দিক-নির্দেশনা এবং সহযোগিতা প্রদান করতে পারলে তারাও দেশ গঠনে উজ্জ্বল ভূমিকা রাখতে সমর্থ হবে। স্বাধীনতার ঘোষক জিয়া, বীরউত্তম, মুক্তিযোদ্ধা জিয়া স্বাধীনতার যুদ্ধে এ দেশের নারীর প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ অংশগ্রহণ অবলোকন করেছেন এবং দেখেছেন তাদের ভূমিকা কোন অংশেই নগণ্য বা নিষ্প্রভ নয়। তাই দেশ গঠনেরও সুযোগ পেলে তারা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারবে এ দৃঢ় বিশ্বাস তাঁর ছিল। রাষ্ট্র, অর্থনীতি, পরিবার ও সমাজজীবনের সকল ক্ষেত্রে নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ (সিডও) গৃহীত হয় এবং ৩ সেপ্টেম্বর ১৯৮১ সালে কার্যকর হয়। বাংলাদেশ এ সনদের তিনটি ধারায় ২, ১৩ (ক), ১৬ (ক) ও (চ) সংরক্ষণসহ এ সনদ অনুস্বাক্ষর করে। ১৯৯৫ সালে চতুর্থ বিশ্ব নারী সম্মেলন বেইজিং-এ অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলনে নারী উন্নয়নের লক্ষ্যে ১২টা কর্মপরিকল্পনা গৃহীত হয়। (১) মহিলাদের ওপর অব্যাহত এবং ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য দূরীকরণ, (২) শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে সমতা, পর্যাপ্ততা এবং সম প্রবেশাধিকার, (৩) স্বাস্থ্যসেবা এবং সংশ্লিষ্ট সেবার ক্ষেত্রে সমতা এবং পর্যাপ্ততা, (৪) নারী নির্যাতন প্রতিরোধ, (৫) বিদেশী দখলাধীন বসবাসকারীসহ নারীর ওপর সশস্ত্র অথবা অন্যান্য সংঘর্ষ প্রতিরোধ, (৬) অর্থনৈতিক অবকাঠামো এবং নীতি, সকল প্রকার উৎপাদনশীল কার্যাবলী এবং সম্পদের অধিকারে সমতা, (৭) সকল পর্যায়ের ক্ষমতায় অংশগ্রহণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারী-পুরুষের মধ্যে সমতা, (৮) নারীর অগ্রগতিতে উৎসাহিতকরণের সকল ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত কাঠামো, (৯) নারীর মানবাধিকার প্রসার ও সংরক্ষণ, (১০) সকল প্রকার যোগাযোগ বিশেষ করে প্রচার মাধ্যমে নারীর অসনাতনী প্রচার, প্রবেশাধিকার এবং অংশগ্রহণে সমতা, (১১) প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশ সংরক্ষণে নারী-পুরুষের মধ্যে সমতা, (১২) কন্যা শিশুদের প্রতি অব্যাহত বৈষম্য দূরীকরণ এবং অধিকার প্রদান। বেইজিং-এ গৃহীত কর্মপরিকল্পনার মূল প্রতিপাদ্য নারী সমাজকে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে নিরাপত্তা প্রদান এবং পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর অংশীদারিত্ব নিশ্চিতকরণ। কিন্তু আমরা অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করি, বেইজিং সম্মেলনের দুই দশক আগেই শহীদ জিয়া এ শর্তগুলো পূরণের লক্ষ্যে জাতীয় মহিলা সংস্থা, জাতীয়তাবাদী মহিলা দল ও মহিলা মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে হলে প্রাথমিকভাবে শিক্ষিত হতে হবে এবং একই সঙ্গে পেশাভিত্তিক দক্ষতা অর্জন করতে হবে। তাই তিনি জাতীয় মহিলা সংস্থার অন্যতম কর্মসূচির মধ্যে গণশিক্ষা, ট্রেডভিত্তিক শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ক শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন। মহিলাদের রাজনৈতিকভাবে সচেতন করার জন্য বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মহিলা দল গঠন করেন। নারী সমাজকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশীদারিত্ব প্রদান করার লক্ষ্যেই সকল পর্যায়ের নীতি-নির্ধারণী কমিটিতে মহিলাদের জন্য সদস্যপদ সংরক্ষিত রেখেছিলেন। সংসদে সংরক্ষিত মহিলাদের আসন সংখ্যা দ্বিগুণ করে ১৫ থেকে ৩০-এ উন্নীত করেছিলেন। মহিলা রাষ্ট্রদূত করেছিলেন, মহিলা অডিটর জেনারেল করেছিলেন।
চাকরির ক্ষেত্রে মহিলাদের জন্য ননগেজেটেড পোস্টে ১৫% এবং গেজেটেড পোস্টে ১০% কোটা নির্ধারণ করেছিলেন। শহীদ জিয়ার মন্ত্রিসভায় মহিলা মন্ত্রীর সংখ্যা ছিল ৬%। তিনি মহিলা পুলিশ, আনসার, ভিডিপি, গঠন করেন। কর্মজীবী মহিলাদের জন্য হোস্টেল প্রতিষ্ঠা করেন। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে তিনি মহিলাদের অগ্রাধিকার প্রদান করেন এবং কম কায়িক শ্রমের পেশায় মহিলাদের নিয়োগের প্রস্তাব করেন। সকল কাজে মহিলাদের উৎসাহিত এবং একই সুযোগ সৃষ্টি করে নারী সমাজের মাঝে শহীদ জিয়া এক অভূতপূর্ব জাগরণ সৃষ্টি করেন। যার ফলে আমরা সরকারের সর্বোচ্চ পদ থেকে শ্রমজীবীদের কাতারে সর্বত্র, সমাজের সর্বস্তরে মেয়েদের নির্ভীক পদচারণা দেখতে পাই। নারীর ক্ষমতায়ন বাস্তবায়িত হোক, পূরণ হোক শহীদ জিয়ার স্বপ্ন, শহীদ জিয়ার ২৩তম শাহাদাত্যবার্ষিকীতে এই আমাদের প্রত্যাশা।
-অধ্যাপিকা শাহরিয়া আখতার বুলু
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
No comments:
Post a Comment