মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে যখন আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলাম, তখন ২৬ মার্চ ১৯৭১ আমার বাসায় আমার জন্মদিনের উৎসব পালন করছিলাম। উৎসবে উপস্থিত ছিলেন আমার পরিবারের সবাই- আমার ছেলেরা, মেয়েরা এবং আমার দুই জামাতা। পরিবারের বু হিসেবে দু’জন উপস্থিত ছিলেন। একজন হলেন শিল্পী দেবদাস চক্রবর্তী ও তাঁর স্ত্রী, আরেক জন মরহুম রশীদ চৌধুরী ও তাঁর ফরাসি স্ত্রী এবং দু’টি মেয়ে। মোমবাতি জ্বালিয়ে অনুষ্ঠান করতে হয়েছিল, তার কারণ তখন অসহযোগসহ চলছিল এবং বিদ্যুৎ ও পানি ছিল না। পানির ব্যবস্থা মিউনিসিপালিটি অন্যভাবে করেছিল- ট্রাক বোঝাই পানি এনে বিভিন্ন বাড়িতে দিয়ে যাচ্ছিল। এই অবস্থার মধ্যেই আমরা জন্মদিনের উৎসব করেছিলাম। চারদিক অকার, বিজলী বাতি নেই; মোমবাতির আলো যদ্দূর যায় তদ্দূরই আমাদের দৃষ্টি। আমরা ভবিষ্যতে কি হবে তা ভাবছি। আনন্দ করছি বটে; কিন্তু ভবিষ্যৎ ভেবে শঙ্কিতও হচ্ছি। রেডিও খুলে রেখেছি। বিভিন্ন চ্যানেলে রেডিও-র ‘নব’ ঘোরাচ্ছি। হঠাৎ একটি চ্যানেলে একটি নতুন কণ্ঠস্বর শুনলাম। কণ্ঠস্বরটি অপরিচিত একজন সৈনিকের। সেই সৈনিকের নাম মেজর জিয়া। তিনি বললেন- “আমি মেজর জিয়া বলছি।” তাঁর কথার মধ্যে একটা উৎসাহের অভিব্যঞ্জনা পেলাম। এতদিন কারো কণ্ঠস্বর শুনিনি। কেউ সাহস করে আমাদের আশ্বাসও দেয়নি। হঠাৎ এই অপরিচিত সৈনিকের আশ্বাস আমাদেরকে নতুন করে আগ্রহী হবার এবং বাঁচবার সাহস দিল। আমার স্ত্রী রেডিওতে এই সংবাদ শুনে আমাকে বললেন- এই ঘোষণাটি তোমার জন্মদিনের একটি সার্থক উপহার। সমস্ত দোকান ব। বাইরে থেকে কিছুই কিনে আনতে পারিনি। কিন্তু এই যে সাহস পেলাম, এটাই তো চরম পাওয়া! যখন আমরা অস্থিরতার মধ্যে বাস করছিলাম এবং শংকার মধ্যে বিমূঢ় অবস্থায় ছিলাম, তখন জিয়ার কণ্ঠস্বর আমাদের উৎসাহ দিল। আমরা ভাবলাম, সামনে এতক্ষণ অকার দেখছিলাম, এখন একটি আলোর রশ্মি আমাদের চোখে ধরা পড়ছে। যখন প্রায় আশাহত অবস্থায় আমাদের দিন কাটছিল এবং মাঝে মাঝে ভাবছিলাম- হয়তো সব হারিয়ে যাবে। কিন্তু জিয়ার কণ্ঠস্বরে আমরা অভয় পেলাম, আমাদের মনে আশ্বাস এনে দিল। একজন ম্রিয়মাণ ব্যক্তি যখন অচৈতন্যের দ্বারপ্রান্তে, তখন চিকিৎসকের সাড়া মেলে তার জীবন জাগ্রত হয়। তেমনি জিয়ার কণ্ঠস্বর আমাদেরকে জাগ্রত করল। ভেবেছিলাম, সবকিছু হারিয়ে যাবে, দুঃখের পসরা নামবে; কিন্তু এই অপরিচিত কণ্ঠস্বর আমাদেরকে আশ্বাসে উজ্জীবিত করল। এটা কোনো রাজনীতিবিদের কণ্ঠস্বর নয়; এটা একজন বিবেকবান মানুষের কণ্ঠস্বর। জীবনে অনেক সংকট আসে। সংকট আমাদেরকে লাঞ্ছিত করে। কিন্তু এই কণ্ঠস্বর শুনে তৎক্ষণাৎ আমাদের বাড়িতে সত্যিকারের উৎসবের আমেজ যেন ফিরে এলো। রশীদ চৌধুরী খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে আরো কয়েকটি মোমবাতি জ্বালিয়ে দিল। আলো খুব উজ্জ্বল না হলেও আমাদের আশা সেই আলো-কেই উজ্জ্বল ভাবলো।
পরবর্তীকালে এ রকম কথা জিয়া বলেননি- এই রকম অভিমত কেউ কেউ পোষণ করেছেন। কিন্তু আমি আমার কানকে তো অবিশ্বাস করতে পারি না, আর আমি তো একা শুনিনি; আমার জন্মদিনের উৎসবে যোগদানকারী সকলেই শুনেছিলেন। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা থাকতাম, তারা প্রতিদিন মাথার ওপর দিয়ে এরোপ্লেন চলে যেতে দেখতাম। এই ছোট ছোট এরোপ্লেনগুলো ক্যান্টনমেন্টে যেতো, ক্যান্টনমেন্টে সৈন্যদের জন্য রসদ সসরবরাহ করত। আমরা অচল হয়ে এরোপ্লেনের যাওয়া আসা দেখতাম।
আমার বাড়িতে অনেকগুলো পোষা কবুতর ছিলো- ১৩টির মতো হবে। পরদিন সকাল বেলা মাঠের মধ্যে কবুতরের যে ঘর ছিল, সে-ঘরগুলোর দরজা খুলে দিলাম। কবুতরগুলো বেরিয়ে এলো, কিন্তু গম খাবার জন্য এগিয়ে এলো না। তারা তাদের ঘরের ছাদের উপর একসঙ্গে বসলো। আমি লক্ষ্য করছিলাম, কবুতরগুলো কি করে তা দেখবার জন্য। অবাক হয়ে দেখলাম, কবুতরগুলো উত্তর-পূর্ব কোণে একত্রে দল বেঁধে উড়ে গেলো। আমি শুনেছিলাম, পশুপক্ষী দুর্ঘটনার আভাস প্রথমে পায়। কবুতরগুলো হয়তো একটি দুর্ঘটনার আভাস পেয়েছিল। তখনই আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম যে, বিশ্ববিদ্যালয়-চত্বরে আমাদের আর থাকা চলবে না।
এরপর আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসা ছেড়ে দিলাম এবং কুণ্ডেশ্বরী কমপ্লেক্সে কয়েকদিনের জন্য আশ্রয় নিলাম। সেখান থেকে রামগড়ে এসে যখন পৌঁছলাম তখন জিয়াউর রহমানকে প্রথম দেখলাম। তিনি দাঁড়িয়ে থেকে সৈন্যদেরকে বিভিন্ন নির্দেশ দিচ্ছেন এবং তাদের দৈনিক ভাতা পরিশোধ করছেন। জিয়ার মুখে তখন দাড়ি ছিল। মনে হলো দাড়ি কামাবার সময় পাচ্ছিলেন না। অবশ্য দাড়িতে তাঁকে ভালোই দেখাচ্ছিল। তিনি আমাদের ইশারায় বসতে বললেন এবং একমনে সৈন্যদের ব্যবস্থা করে যেতে লাগলেন। সেই মুহূর্তটি আমাদের কাছে চিরদিনের জন্য স্বরণীয় হয়ে রয়েছে। কী করে একজন মানুষ সংকটের মুহূর্তেও নিজের দায়িত্ব বুঝে নেয়, জিয়াকে দেখে তা অনুভভ করতে পারলাম। কোনো রাজনৈতিক নেতার নির্দেশ তিনি পাননি, কারো ইচ্ছার অনুকূলেও তিনি কাজ করেন নি; কিন্তু সম্ভাব্য আশঙ্কায় তিনি হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছিলেন। অনেকেই জিয়ার আহবান শুনে তাঁর কাছে চলে এসেছিল। তিনি দেশের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করবার আগ্রহ ছিল এবং সকলের সমর্থন আদায় করবার প্রত্যয় ছিল। এভাবেই আমি জিয়াকে প্রথমে পেয়েছিলাম।
রামগড় থেকে আমরা একটা সরু খাল পার হয়ে ভারতের সাবরুম অঞ্চলে প্রবেশ করেছিলাম। তারপর সেখান থেকে ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলায় আমরা আশ্রয় গ্রহণ করেছিলাম। সেখানে তখন বাংলাদেশ থেকে অনেক শরণার্থী গিয়েছে। সংক্ষেপে বলতে গেলে, আগরতলায় প্রথম আমরা স্থান করে নিয়েছিলাম। পরে আগরতলা থেকে কলকাতায় গেলাম।
কলকাতা থেকে ভারতের বিভিন্ন স্থানে বাংলাদেশের জন্য জনমত সংগ্রহ করলাম। অবশেষে একদিন দেশে ফিরে এলাম- স্বাধীন ভূমিতে।
জিয়াকে তখন আমি পাইনি। তিনি তখন কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের অধিনায়ক হিসাবে কাজ করছেন। আমার ধারণা ছিল, জিয়াই প্রথম সৈন্যদলের কতৃêত্ব পাবেন। কিন্তু সে সময়কার বাংলাদেশ সরকার সেটা করেনি। কি জন্য করেনি, তা নিয়ে অনেকে অনেক রকম ধারণা করেন; কিন্তু আমি সে ধারনা থেকে বিরত থাকলাম।
এরপর দুর্ঘটনা ঘটলো অনেক। শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হলেন, খন্দকার মোশতাক ক্ষমতায় এলেন, কয়েকজন রাজনীতিবিদ- যাঁরা জেলখানায় ছিলেন, তাঁদের হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হলো। আমি তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, ৭ নভেম্বরের ঘটনায় আমাদের দেশের রাজনীতির খেলা পাল্টে গেলো। সিপাহী-জনতা একত্রিত হয়ে জিয়াকে ক্ষমতার শীর্ষে নিয়ে এলো। আমি রাজশাহী থেকে ঢাকায় তখন প্রায়ই আসতাম বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সভায়। এরকম একটি সভায় এসেছি, তখন কেন যেন ইচ্ছে হলো জিয়াউর রহমানের সঙ্গে আমার একটি যোগাযোগ ঘটলো। তখন বিচারপতি সায়েম সাহেব রাষ্ট্রপতি এবং জিয়াউর রহমান উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক। তিনি তাঁর পদাধিকার বলে দেশের অর্থনীতি, পরিকল্পনা এবং শিক্ষা দেখছিলেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য কিছু অধিক অর্থ বরাদ্দ যেন করা হয়, সে জন্য আমি তাঁর সঙ্গে দেখা করেছি। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য কিছু অধিক অর্থ বরাদ্দ দিয়েছিলেন। আমি যত দিন রাজশাহীতে ছিলাম, ততদিন ঢাকায় প্রায়ই আসতে হতো। কখনও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মিটিং-এ কখনও মঞ্জুরি কমিশনের মিটিং-এ। যখনই ঢাকায় আসতাম, তখনই সুযোগ পেলে জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতাম। জিয়াউর রহমান আমাকে তাঁর সঙ্গে দুপুর কিংবা রাতে আহার করতে বলতেন। আমি দেখেছি তাঁর খাবার অতি সাধারণ ছিল। সাদা ভাত, একটি ভাজি, একটি মুগরীর তরকারি এবং ডাল। শেষে একটি মিষ্টি থাকতো। আমি যতদিন তাঁর বাসায় খেয়েছি, ততদিন এই সাধারণ খাবারের পরিবর্তে কোনো বিশেষ খাবার লক্ষ্য করিনি।
একবার ঈদের সময় তাঁর ক্যান্টনমেন্টের বাসায় গিয়েছিলাম। তখন তিনি আমার জন্য এক হাতে ফিরনি, এক হাতে জর্দা নিয়ে এসেছিলেন বাড়ির ভেতর থেকে তখনই আমি বুঝতে পারলাম, এ ব্যক্তির মধ্যে অর্থলাভের স্পৃহা একেবারেই নেই এবং তিনি সাধারণ মানুষের মতো থাকতে ভালোবাসেন। তাঁর গৃহে বিশেষ ধরনের সচ্ছলতা আমি লক্ষ্য করিনি। চাকর-চাকরানি প্রায় ছিল না। দু’একজন যা ছিল, তাদেরও প্রায়ই ছুটি কাটাতে দিতেন। এক কথায় বলতে গেলে, ঐশ্বর্যের প্রতি, ব্যক্তিগত সরঞ্জামের প্রতি তাঁর কোনো মোহ ছিল না। আত্মীয়-স্বজন তাঁর বাড়িতে আমি কখনো দেখিনি। আত্মীয়-স্বজন তাঁর ছিল, কিন্তু তাঁদেরকে ঘনিষ্ঠ হবার সুযোগ তিনি দিতেন না। তাঁর এক ছোটভাই করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার ছাত্র ছিল। তাকেও কখনও আমি জিয়ার বাসায় দেখিনি। নিরহংকার, নির্লোভ একটি সরল মানুষ হিসেবে জিয়াউর রহমানকে আমি পেয়েছি। পরবর্তীকালে আমি যখন জিয়াউর রহমানের কেবিনেটে যোগ দিলাম, তখন একদিন তিনি তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যদের সস্ত্রীক তাঁর বাসভবনে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সেদিনই প্রথম আমরা বেগম জিয়াকে দেখি অত্যন্ত শান্ত একজন গৃহবধুর মতো। জিয়ার বাসভবন কোনোদিন মানুষের কোলাহলে মুখর ছিল না। একটি শান্ত, নিরুত্তাপ পরিবেশে তিনি স্ত্রী এবং দুই পুত্রকে নিয়ে বাস করতেন।
আমি জিয়াউর রহমানকে রাজশাহীতে আমার বাসায় একবার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। খাবার অনেক উপকরণ ছির সেখানে- পাঙ্গাশ মাছ ছিল, ইলিশ মাছ ছিল, মুরগী ছিল, গরুর গোশত ছিল এবং শেষে দৈ ছিল। জিয়া সেদিন অসম্ভব তৃপ্তির সঙ্গে খেয়েছিলেন। তাঁর সঙ্গে তাঁর সচিব কর্ণেল অলি ছিলেন। তিনি জিয়াকে এভাবে খেতে দেখে আমার কাছে অভিযোগ করছিলেন- এতকিছু খেয়ে ওনার তো অসুখ হয়ে যাবে। আমি খন বলেছিলাম- তাঁর খাবার রুচি আছে, আগ্রহও আছে। এই খাওয়াতে বাধা দেবেন না। জিয়া আমার রাজশাহীর বাসায় যে খাবার খেয়েছিলেন, পরে তিনি বহুবার আমার কাছে তা বলেছিলেন।
একজন নির্লোভ, নিরাসক্ত এবং দেশপ্রেমিক মানুষ ছিলেন জিয়াউর রহমান। তাঁর সংকল্প ছিল বাংলাদেশকে একটি উল্লেখযোগ্য দেশে পরিণত করা এবং মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে প্রয়োজনীয় মুহূর্তে কথা বলবার ক্ষমতা রাখে- এমন একটি দেশে পরিণত করা।
জিয়াকে আমরা হারিয়েছি একটি অসতর্ক মুহূর্তে। যারা তাঁকে হত্যা করেছে, তারা কে বা কারা, সে তথ্য এখনও উদঘাটন হয়নি। কিন্তু যারা জিয়াউর রহমানকে চিনতো, তাদের মন থেকে তিনি কখনও মুছে যাবেন না।
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
No comments:
Post a Comment