আসকার ইবনে শাইখ
উনিশ শ একাত্তর। মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহ। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে আওয়ামী লীগের তিন শীর্ষ নেতা সর্বজনাব সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজদ্দিন আহমেদ ও ডক্টর কামাল হোসেনের আলোচনা চলছে। সে আলোচনার কিছুটা আভাস পেতাম আমার অতি-অন্তরঙ্গ বু সৈয়দ নজরুল ইসলামের কাছ থেকে। ইউনিভার্সিটির বাসা থেকে আমি সকালেই চলে যেতাম সৈয়দ নজরুলের আবাস-স্থল রমনা থানার কাছাকাছি একটি বাসায়। সেখান থেকে সৈয়দ নজরুলের সঙ্গেই গাড়িতে করে (সৈয়দ বদরুজ জামানের গাড়ি) রওনা দিতাম বঙ্গবু শেখ মুজিবুর রহমানের বাসার উদ্দেশে। ধানমন্ডির খেলার মাঠের আগখানেই গাড়ি থেকে নেমে যেতাম আমি- উদ্দেশ্য, ২৫ নম্বর গ্রীন কর্নারে নির্ণীয়মান আমার বাসায় পৌঁছানো। .... প্রায় নিশ্চিন্তেই কাটছিলাম সময়। কিন্তু ... পঁচিশে মার্চ। দিন শেষের সেই ভয়ঙ্কর রাত। রাতের প্রথম প্রহর শেষে যা ঘটল, তার যথাযথ বর্ণনা দেয়া এতদিন পর আর সম্ভব নয়। শুধু বলব, সব চিন্তা-চেতনা এলোমেলো হয়ে গেল।
বৃটিশ কাউন্সিলের পাশে ফুলার রোডে জনাকয়েক সতীর্থ প্রাণ দিলেন! প্রাণ হাতে নিয়ে দুরুদুরু বুকে নিশ্চুপ কক্ষে রাত কাটালেন সকলেই! আমরাও! ছাব্বিশের ভোরে হল যথারীতি। হাহাকার ভরা নিষ্প্রাণ ছাব্বিশের দিন। দিনের পর রাত। আমাদের একতলার পাশের ফ্লাটের প্রফেসার সাহেব আমাদের অবস্থা দেখে বললেন- রাতটা তাঁদের সঙ্গেই কাটাতে। রাজি হয়ে গেলাম।
রাতে দু’ফ্ল্যাটের সবাই মেঝেতে শুয়ে আছি। চারদিক সুমসাম, নীরব। তখন মধ্যরাত হবে। হঠাৎ শোনা গেল বুট পায়ে চলার শব্দ। মিলিটারি ...... আমাদের সময়ও ঘনিয়ে এসেছে? পাশে-শোয়া স্ত্রীর হাত আমার হাতে। চুপচাপ। অনেকক্ষণ এমনি অবস্থায় কাটলে মনে হল- ফ্ল্যাটের ঘুপচি ঘাপচিতে ওরা দাঁড়িয়ে নেই তো! হামাগুড়ি দিয়ে জানালা-পথে দেখলাম কেউ কোথাও নেই। ফিরে এসে শুয়ে পড়লাম আগের জায়গাতেই। ভোর হল। জাগল জীবনের সাড়া। রেডিওতে কারফিউ উঠানোর ঘোষণা শুনলাম। সঙ্গে সঙ্গে ইউনিভার্সিটির ফ্ল্যাট ছেড়ে ২৫ নম্বর গ্রীন কর্নারের নির্ণীয়মান বাসার পানে ছুটবার আয়োজন।
বাসায় পৌঁছে রেডিওতে শুনলাম একটি ঘোষণা, যে ঘোষণা শুনে মৃতপ্রায় জীবনে আবার হল প্রাণের সঞ্চার! স্বাধীনতার ঘোষণা!! ঘোষণাকারী কে? একটি নাম। সহসাই একটি নাম.... সেই নাম ‘মেজর জিয়া’ জিয়াউর রহমান। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একজন মেজর। সেনাবাহিনীর একজন মেজর এমনিতে আর কত ‘খ্যাত’ হবেন, ‘অখ্যাত’ অবশ্যই কিন্তু নিয়মিতভাবে কঠোর সামরিক শৃঙ্খলায় শিক্ষাপ্রাপ্ত, সর্বোচ্চ পঞ্চ মেধাবী তরুণ অফিসারের অন্যতম। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে পশ্চিম পাকিস্তানের অতি বিপজ্জনক সেক্টরে ভারতের আক্রমণ প্রতিরোধী এক খ্যাতিমান যশস্বী তরুণ অফিসার। ১৯৬৯ সালের এপ্রিল মাসে জয়দেবপুরে অবস্থিত ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের দ্বিতীয় ব্যাটালিয়নে সেকেন্ড-ইন-কমান্ড।
দিন বয়ে চলে। আসে উনিশ শ’ একাত্তরের মার্চ মাস। পাকিস্তান কতৃêপক্ষের অত্যাচার-নির্যাতনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের প্রতিবাদ-প্রতিরোধ তখন দৃঢ়কণ্ঠ উচ্চারণে উত্তাল। তখনকার ‘পূর্ব-পাকিস্তান ছাত্রলীগ’ ও ‘পূর্ব-পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন’ সহ বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দই চিন্তা চেতনায় প্রাগ্রসর ও বাস্তবাদী। পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর বঞ্চনা-বিরোধী আন্দোলনের পুরোভাগে অবস্থিত বাংলাদেশের উদ্দীপ্ত তারুণ্য। শেখ মুজিবের জনপ্রিয়তা তখন তুঙ্গে বলেই ছাত্র নেতৃবৃন্দের আবদার তাঁর কাছেই বেশি। এতদসত্ত্বেও নানামুখী ‘কৌশল’-এর কারণে শেখ মুজিব আলাপ আলোচনার সুযোগ রক্ষা করতেই ‘স্বাধীনতার ঘোষণা’ দিতে চাননি। তাঁর এ মনোভাব অনুধান করেই ছাত্র নেতৃবৃন্দ গঠন করেন ‘স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ।’ ৩ মার্চ পল্টন ময়দানে এক অতি-বিশাল জনসমাবেশে জনাব শাজাহান সিরাজ ‘স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’-এর পক্ষে পাঠ করেন স্বাধীনতার ইশতেহার। সে সমাবেশে উপস্থিত হয়ে শেখ মুজিব বলেনঃ ‘পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলন চলবে। বাকি কর্মসূচি সম্পর্কে ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে আমার বক্তব্য দেবো।’
অতঃপর .... অতঃপর জনাব শাজাহান সিরাজেরই কথায়, “৭ মার্চের জনসভায় ছাত্র নেতাদের প্রবল চাপের মুখে শেখ মুজিব বাধ্য হয়ে ঘোষণা দিলেন- এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দিবো। তবুও বাংলাদেশকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ্”।
তারপর? তারপর মৃত্যু ফাঁদে পড়া রাজধানী ঢাকার এবং আশপাশ শহরাঞ্চলের সকল মানুষ, কিংকর্তব্যবিমূঢ় বাংলাদেশের জনসাধারণ। পাক হানাদার বাহিনীর উদ্যত রাইফেল তাক করা তখন বাংলাদেশের সর্বশ্রেণীর নারী-পুরুষের বুকে। ইতোমধ্যে ১৯৭০ সালের সেপ্টেম্বরে মেজর জিয়াকে নিয়োগ করা হল চট্টগ্রামে। একই রেজিমেন্টে, একই দায়িত্বে। এই দায়িত্বে থাকাকালীন সময়ে ঊনিশ শ’ একাত্তরের ২৬ মার্চ রাত ২টা বেজে ১৫ মিনিটে বাংলাদেশের মানুষ সহসাই শুনতে পেয়েছিল একটি নাম, ইথারে ভেসে আসা একটি কণ্ঠ, ‘আমি মেজর জিয়া বলছি ....... অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে। আমি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি।’
সহসাই ইথারে ভেসে এসেছিল একটি নাম, একটি ঘোষণা। কিন্তু এই ‘সহসা’র আগে ছিল বেশ কিছু নাটকীয় প্রস্তুতি। মেজর জিয়ার ডায়েরী অনুসারে, “চট্টগ্রামে আমরা ব্যস্ত ছিলাম অষ্টম ব্যাটালিয়নকে গড়ে তোলার কাজে। এটা ছিল রেজিমেন্টের তরুণতম ব্যাটালিয়ান। এটার ঘাঁটি ছিল ষোলশহর বাজারে। ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে এই ব্যাটালিয়নকে পাকিস্তানের খারিয়ানে নিয়ে যাওযার কথা ছিল। এর জন্য আমাদের সেখানে পাঠাতে হয়েছিল দু’শ জওয়ানের এক দ্রুতগামী দল। অন্যরা ছিল একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ের সৈনিক। আমাদের তখন যে সব অস্ত্রশস্ত্র দেয়া হয়েছিল, তার মধ্যে ছিল ৩শ’ পুরানো ০০৩ রাইফেলস, চারটা এলএমজি ও দুটি তিন ইঞ্চি মর্টার। গোলাবারুদের পরিমাণও ছিল নগণ্য। আমাদের এন্টিট্যাঙ্ক বা ভারি মেশিনগান ছিল না। ফেব্রুয়ারীর শেষ দিকে বাংলাদেশের যখন রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিস্ফোরণোন্মুখ হয়ে উঠেছিল, তখন আমি একদিন খবর পেলাম তৃতীয় কমান্ডো ব্যাটালিয়নের সৈনিকরা চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন এলাকায় ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে বিহারীদের বাড়ীতে বাস করতে শুরু করেছে। খবর নিয়ে আমি আরো জানলাম কমান্ডোরা বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র আর গোলাবারুদ নিয়ে বিহারী বাড়ীগুলোতে জমা করেছে এবং রাতের অকারে বিপুল সংখ্যায় তরুণ বিহারীদের সামরিক ট্রেনিং দিচ্ছে; এবং এসব থেকে এরা যে ভয়ানক রকমের অশুভ একটা কিছু করবে তার সুস্পষ্ট আভাসই আমি পেলাম।
তারপর এলো ১ মার্চ। এই সময়ে আমার ব্যাটালিয়নের এনসিওরা আমাকে জানালো “প্রতিদিন স্যায় বিংশতিতম বালুচ রেজিমেন্টের জওয়ানরা বেসামরিক পোশাক পরে ট্রাকে করে কোথায় যেন যায়। তারা ফিরে আসে আবার শেষ রাতের দিকে।” আমি উৎসুক হলাম, লোক লাগালাম খবর নিতে। খবর নিয়ে জানলাম প্রতিরাতেই তারা যায় কতকগুলো নিদিষ্ট বাঙালি পাড়ায়, নির্বিচারে হত্যা করে সেখানে বাঙালিদের। এই সময় প্রতিদিন ছুরিকাহত বাঙালিদের হাসপাতালে ভর্তি হতেও শোনা যায়।
এ সময়ে আমাদের কমান্ডিং অফিসার লেঃ কর্ণেল জানজুয়া আমার গতিবিধির ওপর লক্ষ্য রাখার জন্যে লোক লাগায়। মাঝে মাঝেই তার লোকেরা গিয়ে আমার সম্পর্কে খোঁজ খবর নিতে শুরু করে। আমরা তখন আশংকা করছিলাম হয়তো নিরস্ত্র করা হবে। আমি আমার মনোভাব দমন করে কাজ করে যাওয়ার সম্ভাব্য সব ব্যবস্থা গ্রহণ করি। বাঙালি হত্যা ও বাঙালি দোকান পাটে অগ্নি সংযোগের ঘটনা ক্রমেই বাড়তে থাকে।
আমাদের নিরস্ত্র করার চেষ্টা করা হলে কি ব্যবস্থা গ্রহণ করবো কর্নেল (তখন মেজর) শওকতও আমার কাছে তা জানতে চান। ক্যাপ্টেন শমসের মবিন এবং খালেকুজ্জামান আমাকে জানান যে, স্বাধীনতার জন্য আমি যদি অস্ত্র তুলে নেই তাহলে তারাও দেশের মুক্তির জন্য প্রাণ দিতে কুণ্ঠাবোধ করবে না। ক্যাপ্টেন অলি আহমদ আমাদের মাঝে খবর আদান-প্রদান করতেন। জেসিও এবং এনসিওরাও দলে দলে বিভক্ত হয়ে আমার কাছে বিভিন্ন স্থানে জমা হতে থাকলো। তারাও আমাকে জানায় যে, কিছু একটা না হলে বাঙালি জাতি চিরদিনের জন্য দাসে পরিণত হবে। আমি নীরবে তাদের কথা শুনতাম। কিন্তু আমি ঠিক করেছিলাম উপযুক্ত সময় এলেই আমি মুখ খুলবো। সম্ভবত ৪ মার্চে ক্যাপ্টেন অলি আহমদকে ডেকে নেই। আমি তাকে সোজাসুজি বললাম, সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করার সময় দ্রুত এগিয়ে আসছে।
৭ মার্চে রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবের ঘোষণা আমাদের কাছে গ্রীন সিগন্যাল বলে মনে হলো। আমাদের পরিকল্পনাকে চূড়ান্ত রূপ দিলাম। .... ১৭ মার্চ স্টেডিয়াম ই বি আর সির লেঃ কর্নেল এ আর চৌধুরী, আমি, ক্যাপ্টেন অলি আহমদ ও মেজর আমিন চৌধুরী এক গোপন বৈঠকে মিলিত হলাম। এক চূড়ান্ত যুক্ত পরিকল্পনা গ্রহণ করলাম।
দুদিন পর ইপিআর-এর ক্যাপ্টেন (এখন মেজর) রফিক আমার বাসায় গেলেন এবং ইপিআর বাহিনীকে সঙ্গে নেবার প্রস্তাব দিলেন। আমরা ইপিআর বাহিনীকে আমাদের পরিকল্পনাভুক্ত করলাম।”
তারপর আছে পাকিস্তানী অফিসারদের কার্যাবলি এবং সেসব ব্যর্থ করায় মেজর জিয়ার কৃতিত্বের কথা। অতঃপর রক্তের আঁখেরে বাঙালির হৃদয়ে লেখা একটি ক্ষণ’- এর কথা সহসাই একটি নামের কথা- “আমি মেজর জিয়া বলছি।” পাক হানাদার বাহিনীর মৃত্যু খেলার মধ্য দিয়ে আরম্ভ হয়ে বাঙালিদের প্রতিরোধ সংগ্রাম, মুক্তি যুদ্ধ। সে যুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম. এ. জি. ওসমানী, মেজর জিয়া অন্যতম সেক্টর কমান্ডার, জেড ফোর্সের অধিনায়ক। মৃত্যুর ফাঁদে আটকে পড়া এ জনপদের রাজধানী শহর বন্দর গ্রামের সকল অধিবাসী সাহসে ভর করে ঘুরে দাঁড়াল পাক-হানাদরদের বিরুদ্ধে। পৌনে নয় মাস রক্তরঞ্জিত মুক্তিযুদ্ধের পর এল ১৬ ডিসেম্বর উনিশ শ’ একাত্তর। বিজয় দিবস! স্বাধীনতা!!
সহসাই যে নামের মানুষটি দিয়েছিলেন স্বাধীনতার ঘোষণা, স্ত্রী-পুত্র-পরিজনের নিরাপত্তার কথা মুহূর্তের জন্যও না ভেবে যে ‘অখ্যাত’ মেজরটি তাঁর বাহিনী নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন সেই স্বাধীনতার যুদ্ধে, সে যুদ্ধেরই অনুভূতির প্রকাশ ঘটেছে তাঁরই লেখা ডায়রীতে- “জীবনের সবচেয়ে বড় ঘটনা কখনও মুছে যায় না স্মৃতি থেকে। সে ঘটনা যদি হয় একটি যুদ্ধের, হয় একটি স্বাধীনতা যুদ্ধের, তখন স্মৃতি হয় একটি জীবন্ত ইতিহাস। তার মর্মর ফলকে উৎকীর্ণ হয়ে থাকে মরণপণ সেই যুদ্ধের প্রতি মুহূর্তের আবেগ, প্রতিটি আত্মদান, এর প্রতি বিন্দু রক্তস্খলনের প্রতিচ্ছবি। সেখানে অনির্বাণ শিখার মতো জ্বল জ্বল করে সে সব মুখ যারা পাশাপাশি যুদ্ধ করতে করতে লুটিয়ে পড়ছিল আপন ভূমির এক মুঠো মাটি দু’হাতে আঁকড়ে ধরে থেকে। বিজয়ের গর্ব আরক্ত মুখগুলোতে। মাটিতে ঢলে পড়ার আগের মুহূর্তে ওরা দেখেছে প্রিয় মাতৃভূমির অন্তত একখণ্ড জমি মুক্ত হয়েছে। মুক্ত জমীনের সেই বাতাসটুকু স্বাধীনতার বাতাস। কি স্নিগ্ধ, কি নির্মল তার সৌরভ। শেষ নিঃশ্বাস ফেলবার আগে সেই বাতাসটুকু তাদের গায়ে মুখে বুলিয়ে দিয়ে গেছে একরাশ স্নেহময় ছোঁয়া। যেন মায়ের শান্তি ঝরানো হাতের শেষ আদর। ঘুমিয়ে পড়েছে ওরা মাতৃভুমির সেই চির শ্যামল ছবিটি রেখে যেখানে আদিগন্ত মাঠ জুড়ে ধানের স্বর্ণালী লাবণ্য, যার প্রতিটি রেণুতে রূপ ধরে আছে পরিশ্রমী কৃষকের বেঁচে থাকার স্বপ্ন। যেখানে নদীর কিনারে কলাপাতার ছায়া দুলছে মেটে ঘরগুলোর চালের উপর। সূর্যের আলোয় ঝিকিমিকি নারকেল সুপারির সবুজ পালায় নিকানো উঠানো এক কোণে লাউয়ের মাচানের তলায় বসে এই মুহূর্তে হয়তো চাল ঝাড়ছেন কোন মা। ফুটফুটে একটি সুন্দর শিশু বিভোর ঘুমিয়ে আছে পাশের হোগলার বিছানাটিতে। সুন্দর নিটোল স্বর্গীয় এই ছবিটির নামই তো বাংলাদেশ। তাকে বাঁচিয়ে রাখবার জন্যই তো এই মৃত্যু! এই যুদ্ধ! রক্তমাখা ঘাসের তলায় লাখো কোটি বছরের উর্বর পলি মাটি। সেই মাটির পাঁজরে পাঁজরে আঁকা প্রিয়তর এটি দেশের মুখ। তার বুক থেকে অঙ্কুরিত প্রতিটি তৃণের ডগায় একটি মানচিত্র। ‘বাংলাদেশ যার নাম’। এই ছবি দেখে মরতে পারার যে আনন্দ তার আভাসই তো লেগে আছে মৃত স্বাধীনতা-যোদ্ধার ঠোঁটে। পিঠের তলায় তার স্বদেশের মাটি। রাইফেল ধরা হাত লেপ্টে আছে সেই
মাটিতে। সবুজ ঘাসের গালিচা তার শয্যা, তৃণের ফুল তার অন্তিম শয্যার শেষ উপহার। এই যে মৃত্যু, তার চাইতে সুন্দর আর কি হতে পারে? কোন মরণই কি হতে পারে এর চেয়ে সার্থক?
তাদের সবার হাতে মাটি। বুকে-মুখে-পিঠে মাটি। চাপ চাপ রক্তের লাল হয়ে থাকা সেই মাটিতে প্রত্যাশার শেষ স্বাক্ষর এঁকে তারা বলে গিয়েছে “স্বদেশের মাটির স্বাধীনতার জন্যে কেমন করে মরতে হয়, সেই ও নযীর আমরা রেখে গেলাম। তোমাদের জন্যে। তোমরা দেশের প্রতিকণা ধুলাকে মুক্ত করবে সেই ভরসায় আমরা এখানে ঘুমিয়ে পড়লাম শান্তিতে। ঘুমিয়ে পড়লাম স্বাধীনতার এক বুক বাতাসের সুবাস নিয়ে।”
‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে’ অর্জিত হল বাংলাদেশের স্বাধীনতা। কিন্তু তা ঠিক ‘মেজর জিয়া’ ঘোষিত স্বাধীনতা নয়, কিছুটা ঘোরপ্যাচের কারসাজিতে ‘অনুঘটিত স্বাধীনতা’। একটি জনপদে একটি শক্তি দ্বারা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে কোন শাসক শক্তির পতনে সেই ‘একটি শক্তির’ উত্থান ঘটতে পারে। এই পতনে উত্থানে অনুঘটক শক্তির ‘অবদান’ অনেক ক্ষেত্রেই মারাত্মক ও অকল্যাণকর হতে পারে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও তেমনটিই হয়েছিল।
‘মেজর জিয়া’ ঘোষিত এবং জেনারেল ওসমানী পরিচালিত মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ছিল আওয়ামী লীগের হাতে। যুদ্ধ চলাকালে আওয়ামী নেতৃত্বকে অনুঘটক শক্তির স্বর্ণমুক্তির জন্য তার সঙ্গে একটি বন চুক্তিতে আবদ্ধ হতে হয়েছিল যার পরিণাম খুব একটি সুখকর বলে প্রমাণিত হয়নি। তদুপরি, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরই তার পরিচালনা কার্যও হয়ে পড়েছিল নানাবিধ প্রশ্নের সম্মুখীন এবং এসবের পরিণামে দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে দেখা দেয় ভয়ঙ্কর ও মর্মান্তিক রকমের নানা বিপর্যয়।
এখানে উল্লেখ্য যে, উনিশ শ’ একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বরের পর অন্যান্যদের মত সেনাবাহিনীতে প্রমোশন পেয়ে মেজর জেনারেল এবং ডেপুটি চীফ অফ স্টাফ হলেন ‘মেজর জিয়া’। ব্যস, অতঃপর ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্টের মর্মান্তিক ঘটনার পর পর্যন্ত চাকুরীর কর্তব্য পালন ছাড়া ‘অন্যান্য সকল কর্মকাণ্ডে’ তিনি থাকলেন পুরোপুরি নিস্পৃহ এবং এই নিস্পৃহতা কাটল শুধু দেশ ও সময়ের ডাকে। ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট এক সামরিক বিদ্রোহ রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবর রহমান নিহত হলে দেশে সামরিক শাসন জারি করা হয়। ২৫ আগস্ট খন্দকার মোশতাকের সরকার তাঁকে সেনাবাহিনীর চীফ অফ স্টাফ নিযুক্ত করে। পঁচাত্তরের নভেম্বরে পুনরায় সংঘটিত হয় সেনাবিদ্রোহ, ক্ষমতাচ্যুত হন খন্দকার মোশতাক এবং প্রেসিডেন্ট হন বিচারপতি আবু সাদত মোহাম্মদ সায়েম।
অতঃপর ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক জোয়ান-জনতার বিপ্লবে জিয়াউর রহমান পুনরায় সেনাবাহিনীর চীফ অফ স্টাফ নিয়োজিত হন এবং প্রাপ্ত হন উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব, দেশ ও সময়ের ডাকে এবার আরম্ভ হয় তাঁর দেশ গড়ার কার্যক্রম। ১৯৭৬ সালের ৮ মার্চ মহিলা পুলিশ বাহিনী গঠন, ওই বছরেই কলম্বোতে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন সম্মেলনে যোগদান এবং বাংলাদেশের ৭ জাতি গ্রুপের চেয়ারম্যান পদ লাভ। ১৯৭৬ সালেই উলশি যদুনাথপুর থেকে স্বেচ্ছাশ্রমে খাল খনন উদ্ধোধন করেন এবং সে বছরেরই ২৯ নভেম্বর প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হন। তারপর ১৯৭৬-এ গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী গঠন, ১৯৭৭ এর ২০ ফেব্রুয়ারি একুশে পদক প্রবর্তন, এপ্রিলের ২১ তারিখ বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট হিসাবে শপথ গ্রহণ, মে মাসে ১৯ দফা কর্মসূচি ঘোষণা এবং প্রেসিডেন্ট হিসাবে তাঁর প্রতি জনগণের আস্থা যাচাইয়ের জন্য ৩০মে গণভোট অনুষ্ঠান ও হঁ্যা-সূচক ভোটে বিপুল জন-সমর্থন লাভ।
অতঃপর ১৯৭৭-এর ৮ জুন লন্ডনে কমনওয়েলথ যোগদান, সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি বাতিল করে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের দেশে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ সংযোজন, সমাজতন্ত্রের বদলে ‘সামাজিক ন্যায় বিচার’ সংস্থাপন, ভাষাভিত্তিক জাতীয়তার পরিবর্তে দেশভিত্তিক বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের সংযোজন, এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত ধর্মভিত্তিক দলগুলোকে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রদান এবং জাগদল নামে একটি দল গঠনের ক্রমপর্যায়ের একটি ফ্রন্ট গঠন করে সেই ফ্রন্টের প্রার্থী হিসাবে ১৯৭৮-এর নির্বাচনে বিপুল ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গঠন করে এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হন।
বাংলাদেশ জাতীসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ১৯৭৮ সালেই ১৯৭৮-৮০ সালের জন্য অস্থায়ী সদস্য পদ লাভ করে। ১৯৭৮ সালেই তিনি প্রতিরক্ষা বাহিনীর সর্বাধিনায়কের পদে অধিষ্ঠিত হন। জাতীয় সংসদে সংবিধানের প্রথম সংশোধনী পাস হলে তিনি ১৯৭৯ সালের ৭ এপ্রিল সামরিক আইন প্রত্যাহার করেন। ১৯৮০ সালে মক্কা মোয়াজ্জেমার তায়েফে ইসলামী শীর্ষ সম্মেলনে ও জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভাষণ দান করেন। ১৯৮০ সালে পাস করান যৌতুক-বিরোধী আইন এবং চালু করেন গ্রাম সরকার।
ওই সময়ে ইরাক-ইরান যুদ্ধ বরে জন্য মধ্যস্থতাকারীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায়ও অবতীর্ণ হন তিনি। ১৯৮১ সালের ২১ এপ্রিল দক্ষিণ এশীয় ফোরাম গঠনের প্রস্তাব ও পরিকল্পনা উত্থাপন করেন প্রেসিডেন্ট জিয়া। একজন কঠোর পরিশ্রমী প্রেসিডেন্ট হিসাবে সর্বক্ষণ জনগনের কল্যাণ চিন্তা, বাংলাদেশী জাতিকে সাহস-উৎসাহ দিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে নেয়ার প্রয়াস ছিল তাঁর জীবন-স্বপ্ন। তাঁর শাসনামলেই দেশে পূর্ণ গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে চলার শুভযাত্রা শুরু হয়। ..... অতঃপর আসে ১৯৮১ সালের ৩০ মে! .... তাঁর জানাযায় কত লক্ষ লোকের সমাবেশ ঘটেছিল কে জানে। শুধু জানি, অনেক চেষ্টা করেও ফার্মগেটের কাছাকাছি যেতে পেরেছিলাম। তারপ একদিন লিখেছিলাম সাধারণ মানুষের পক্ষ হয়ে একটি গান-
জিয়া তুমি আছ মিশে
বাংলাদেশের ধানের শীষে।
জানি না তো ভাতের দেনা শুধব কিসে!!
আজও যখন খিদার জ্বালায়
দৃষ্টি পড়ে ভাতের থালায়,
তুমি এসে শহীদ জিয়া সামনে দাঁড়াও। হাসিমুখে অভয় দিয়ে হাতটি বাড়াও।
আজও যখন বন্যা-খরায়
অবুঝ এমন দিশা হারায়,
তুমি এসে চলার পথে আলোক ছড়াও।
রাষ্ট্রপতি কোদাল হাতে কদম বাড়াও।
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
No comments:
Post a Comment