জিয়াউর রহমান ও আধুনিক বাংলাদেশ

প্রফেসর ড. জসীম উদ্দিন আহমদ

আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার ভিত রচনা করেছেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। তাই তাঁকে আধুনিক বাংলাদেশের স্থপতি হিসেবে অভিহিত করা হয়। তিনি সারা দুনিয়ায় তলাবিহীন ঝুড়ির দেশ হিসেবে খ্যাত বাংলাদেশকে আত্মপ্রত্যয়ী ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন জাতিরূপে পরিচিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি আমাদের মাথা উচু করে দাঁড়ানোর প্রেরণা যুগিয়েছেন। এ প্রেরণা আমাদের যুগ যুগ ধরে অনুপ্রাণিত করবে।

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়ার কণ্ঠে প্রচারিত হয় আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণা। এই ঘোষণায় দিশেহারা একটি জাতি উদ্বুদ্ধ আর ঐক্যবদ্ধ হয়ে জীবন বাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল। লাখো শহীদের রক্ত আর কোটি মানুষের ত্যাগের বিনিময়ে মাত্র নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমেই আমরা আমাদের প্রিয় মাতৃভূমির স্বাধীনতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি। বিশ্ব ইতিহাসে এটি একটি অনন্য ঘটনা।

সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের মানুষের জনসাধারণের বুকে ছিল অপরিসীম আশা। সকলের মনে ছিল একটি সব ধরনের শোষণ ও বঞ্চনা থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। মুক্তিযুদ্ধের আগুন ঝরা দিনগুলোতে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব অনুপস্থিত কিংবা প্রতিবেশী দেশে আরাম-আয়াশে ব্যস্ত থাকার কারণে যেমন করে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনা অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছেন, তেমনিভাবে ব্যর্থ হয়েছিলেন স্বাধীনতার পর দেশ থেকে শোষণ আর বঞ্চনা অবসানের জন্য সঠিক কার্যক্রম গ্রহণ করতে। তাই ১৯৭২-৭৫ তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের দেশ পরিচালনার প্রায় সাড়ে তিন বছরের সময়কে আমাদের জাতীয় জীবনের এক কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সে সময় আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির এতো মারাত্মক অবনতি হয়েছিল যে, মানুষের জীবনের স্বাভাবিক নিরাপত্তা প্রায় উধাও হয়ে গিয়েছিল। দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের কৃত্রিম সংকটের কারণে দেশের অধিকাংশ মানুষের জীবনে নেমে এসেছিল চরম অশান্তি। স্বাধীনতার তিন বছর পর ১৯৭৪ সালে দেশের প্রধান খাদ্যবস্তুু চালের দাম স্বাধীনতা-পূর্ব আমলের তুলনায় প্রায় দশগুণ বৃদ্ধি পায়। এর ফলে দেশে স্মরণাতীতকালের মহাদুর্যোগ, দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়।

এই দুর্ভিক্ষে সরকারি হিসাব অনুযায়ীই ২৬ হাজার লোক মারা যায। প্রকৃতপক্ষে প্রায় দেড় লাখের বেশি লোক দুর্ভিক্ষের কারণে মারা যায় বলে বেশিরভাগ বেসরকারি সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছিল।

স্বাধীনতার পরের প্রথম তিন বছরেই যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের অর্থনীতি ও অবকাঠামো তৈরির জন্য প্রচুর বৈদেশিক সাহায্য পাওয়া গিয়েছিল। এই সাহায্যের পরিমাণ স্বাধীনতার আগের বিশ বছরের প্রাপ্ত সাহায্যের প্রায় সমান ছিল। সে সময়ে সরকারি দলের লোকজনের সীমাহীন দুর্নীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যর্থতার ফলে জনজীবন দিন দিনই দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল। অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অবাধ লুটপাটের ফলে একদল লোক রাতারাতি অঢেল সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলে। দেশের সম্পদ জনগণের কল্যাণে ব্যয় না করে কিছু পরিবার ও দলীয় লোকজনকে অন্যায়ভাবে রাতারাতি বড় লোক করার জন্য যথেচ্ছভাবে ব্যবহৃত হতে থাকে।

এই অবস্থায় আঁধারঘেরা একটি পরিবেশ থেকে মুক্তির জন্য স্বাধীনতার সুফল সকলের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়া এবং একটি পরিবর্তনের আশায় জনসাধারণ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল। এমনি পরিস্থিতিতে ঘটে ১৯৭৫ সালের মধ্য আগস্টের পটপরিবর্তন। এরপর ঘটনা-প্রবাহের ধারাবাহিকতায় ৭ নভেম্বরের সিপাহী-জনতার এক ঐতিহাসিক বিপ্লবের মাধ্যমে প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতির একটি দেশ পুনর্গঠনের দায়িত্ব এসে পড়ে স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমানের ওপর। দেশের ঐতিহাসিক প্রয়োজনে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন আবার আর এক ঐতিহাসিক প্রয়োজনে দেশ গড়ার দায়িত্বও কাঁধে নিলেন।

দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেয়া পর প্রেসিডেন্ট জিয়া বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের বিকাশ এবং দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য সকল দেশপ্রেমিক জনগণের একতা গড়ে তোলার প্রয়াস নেন। তিনি ‘বাংলাদেশী জাতীয়বাদ’ প্রব েসুস্পষ্টবভাবে উল্লেখ করেছেন, “আমাদের মূল লক্ষ্য তথা বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ভিত্তিমূল রয়েছে যে শোষণমুক্ত সমাজের স্বপ্ন, তাকে বাস্তবে রূপ দিতে হবে পরিকল্পিত পদ্ধতিতে; জনগণের সম্মিলিত অংশগ্রহণের মাধ্যমে। শোষণমুক্ত সমাজ বলতে মূলত বোঝায় ধর্ম, বর্ণ ও গোত্র নির্বিশেষে সকল মানুষের জন্য খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা, বাসস্থান, স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনার মৌলিক চাহিদাপূরণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা। ..... একথা শোষণমুক্ত সমাজ যা অত্যন্ত বাস্তব ও প্রগতিশীল একটি সমাজ(সেখানে থাকবে সমতা, নিরপেক্ষতা ও ন্যায় বিচার।”

এই ‘শোষণমুক্ত সমাজ’ গড়ার অভিলক্ষ্যে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯ দফা কর্মসূচি প্রণয়ন করেছিলেন। তাঁর প্রণীত ঐতিহাসিক ১৯ দফা কর্মসূচি সত্যিকার অর্থেই বাংলাদেশে উন্নয়নের রাজনীতির সূচনা করেছিল। এই কর্মসূচির প্রথমটিতেই তিনি ‘সর্বতোভাবে দেশের স্বাধীনতা, অখণ্ডত ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা’র শপথ ব্যক্ত করেছিলেন। শহীদ জিয়ার দেশপ্রেমের আদর্শ আমাদের যুগে যুগে প্রেরণার উৎস হয়েই থাকবে। শহীদ জিয়া তাঁর ১৯ দফার অন্য একটি কর্মসূচিতে সর্ব উপায়ে নিজেদেরকে একটি আত্মনির্ভরশীল জাতি হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন। অন্য দু’টি কর্মসূচিতে তিনি ‘সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে কৃষি উন্নয়নের মাধ্যমে গ্রামীণ তথা জাতীয় অর্থনীতিকে জোরদার করা এবং দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা এবং কেউ যেন ভুখা না থাকে তার ব্যবস্থা করার’ অঙ্গীকার করেছিলেন। এই জন্যই শহীদ জিযা কৃষির আধুনিকায়নের মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন দ্বিগুণ করার প্রচেষ্টা গ্রহণ করেন। তিনি বাংলাদেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার ক্ষেত্রে বহুদুর এগিয়েছিলেন। স্বাধীনতার পরের কয়েক বছর তৎকালীন সরকারের অব্যবস্থাপনার ফলে কৃষি উৎপাদন বেশ কমে গিয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ দেশের প্রধান ফসল ধান উৎপাদনের কথা বলা যায়। ১৯৭৪-৭৫ সালে দেশে ধান উৎপাদনের মোট পরিমাণ ছিল ১ কোটি ১১ লাখ ৯ হাজার মেট্রিক টন। শহীদ জিয়ার আমলে আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা প্রবর্তনের ফলে অর্থাৎ জমিতে সার ও সেচের যথাযথ প্রয়োগের ফলে কৃষি উৎপাদন বেশ বৃদ্ধি পায়। তাই ১৯৮০-৮১ সালে দেশে মোট ধান উৎপাদনের পরিমাণ এসে দাঁড়ায় ১ কোটি ৩৬ লাখ ৬২ হাজার মেট্রিক টনে, যা ৭৪-৭৫ সালে দেশে ধান উৎপাদনের পরিমাণ এসে দাঁড়ায়। ১ কোটি ৩৬ লাখ ৬২ হাজার মেট্রিক টনে, যা ৭৪-৭৫ সালের তুলনায় ১.২৩ গুণ বেশি। ধান উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় বাজারেও এর শুভ প্রভাব পড়ে। ১৯৭৪-৭৫ সালে যেখানে চালের প্রতি কেজির মূল্য ছিল। ১০ টাকার বেশি ১৯৮০-৮১ সালে তা প্রায় অর্ধেক অর্থাৎ ৫-৫৫ টাকায় নেমে আসে। এর ফলে বাংলাদেশের জনগণের জীবনে দু বেলা দু মুঠো ভাত খাওয়ার স্বাপ্ন বাস্তবে পরিণত হয়েছিল। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাসনামলে শুধু যে ধানের উৎপাদন বেশ বৃদ্ধি পেয়েছিল তাই নয়, অন্যান্য কৃষিজ পণ্য যথা(আখ, গম, শাক-সবজি ইত্যাদির উৎপাদনও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল।

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়া বিশ্বাস করতেন যে, বাংলাদেমের গ্রামগুলোর উন্নয়ন চাড়া সারাদেশের উন্নয়ন অর্থাৎ স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়া সম্ভব নয়। তাই স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার জন্য স্বনির্ভর গ্রাম সরকার প্রতিষ্ঠার কর্মসূচি নিয়ে তিনি বাস্তবায়নের লক্ষেও বেশ কিছুটা এগিয়েছিলেন। কৃষিভিত্তিক বাংলাদেশকে স্বনির্ভর করার লক্ষ্যে তিনি উৎপাদনের রাজনীতি এবং কৃষির আধুনিকায়নের প্রচেষ্টা গ্রহণ করেন। তিনি কৃষি ব্যবস্থার আমূল সংস্কারের প্রয়াস নেন। এর উদ্দেশ্য ছিল দেশের খাদ্য উৎপাদন দ্বিগুণ করা।

প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান দেশের স্বনির্ভরতার জন্য মাছের চাষ, হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশু পালন কয়েকগুণ বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছিলেন। তাঁর আমলে মাছ উৎপাদন ও পশু সম্পদসহ অন্যান্য ক্ষেত্রেও বেশ উন্নয়ন সাধিত হয়েছিল। দেশের জনসধারণ যাতে সুষম খাদ্য গ্রহণ করতে পারে এ জন্য ছিল তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টা। প্রেসিডেন্ট জিয়া উন্নয়নের জন্য সারাদেশের জনগোষ্ঠীকে উদ্দীপ্ত করতে পেরেছিলেন। তিনি সব সময় জোর দিয়ে বলতেন, “আমাদের পরিশ্রমী, শক্ত হাতই আমাদের অর্থনীতি।” অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার জন্য, দেশের উন্নয়নের জন্য জাতীয়ভাবেও যে পরিশ্রমের বিকল্প নেই তা প্রেসিডেন্ট জিয়া মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতেন।

জিয়াউর রহমান শিক্ষা উন্নয়ন ও প্রসারের জন্য সবিশেষ অবদান রেখেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে দেশের উন্নয়নের জন্য, অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য শিক্ষার কোনও বিকল্প নেই। এ জন্য ১৯৮০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তিনি নিরক্ষরতা দূরীকরণ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। এই কর্মসূচির আওতায় ৫ বছরের ভেতরই দেশের ৮০ ভাগ মানুষকে অক্ষর জ্ঞানসম্পন্ন করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল। তিনি শিক্ষাঙ্গনে বিশৃংখলা অবস্থার উন্নয়ন ঘটিয়ে দেশে একটি যুগোপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থা চালুর প্রচেষ্টা নিয়েছিলেন। তাঁর সময় থেকেই দেশে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক শিক্ষার উপর জোর দেয়া হয়। প্রেসিডেন্ট জিয়া নারী শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা ও বৃত্তিমূলক বিভিন্ন শিক্ষার উপরও যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তিনি মাদ্রাসা শিক্ষাকে যুগোপযোগী করার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছিলেন এবং এ ব্যাপারে সঠিক কার্যক্রম গ্রহণ করেছিলেন।

স্বাধীনতার পর প্রথম কয়েক বছর দেশের শিল্পোৎপাদনের দিকে কোনও নজর দেয়া হয়নি। পাট, চামড়াসহ অধিকাংশ শিল্প মুখ থুবড়ে পড়ে। দেশের অধিকাংশ শিল্প-কারখানা ব হয়ে যায় এবং বেশির ভাগই রুগ্ন শিল্পে পরিণত হয়। প্রেসিডেন্ট জিয়া শিল্প প্রসারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। ব হয়ে যাওয়া শিল্প কারখানাগুলো সচল করা ছাড়াও তাঁর আমলে হাজার হাজার ছোট-মাঝারি শিল্প কারখানা স্থাপিত হয়। বেসরকারি খাতে পোশাক শিল্পে উৎসাহ প্রদান তাঁর আমল থেকেই শুরু হয়্‌ এতদুদ্দেশ্যেই পরিবর্তীতে বাংলাদেশে পোশাক শিল্পের বিকাশ ঘটে। বর্তমানে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি শিল্পের উন্নয়ন ও বিকাশের ভিত রচনা করেছিলেন শহীদ জিয়া। বাংলাদেশের রাসায়নিক সার কারখানা স্থাপনের সূচনাও হয়েছিল প্রেসিডেন্ট জিয়ার সময়েই। তিনি সত্যিকার অর্থেই বিশ্বাস করতেন যে শিল্পোন্নয়ন ছাড়া একটি জাতি উন্নয়নের পথে কোনোক্রমেই অগ্রসর হতে পারে না।

এই অঞ্চলের জনগণ চাষাবাদের পানির জন্য প্রকৃতির ওপরই নির্ভরশীল ছিল। তাই খরা প্রয়োজনের সময় পানির অভাবে প্রায়ই কৃষি উৎপাদন দারুণভাবে ব্যাহত হচ্ছিল। এই জন্য সেচ সুবিধা বৃদ্ধি ও খরার সময় পানি সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য তিনি ‘খাল কাটা’ কর্মসূচি গ্রহণ করেন। শহীদ জিয়া বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে নিজ হাতে কোদাল নিয়ে খাল কাটা উদ্বোধন করেছেন। দেশের জনগণ, ছাত্র-শিক্ষক, কৃষক, শ্রমিক, সরকারি কর্মচারি সকলেই এতে অনুপ্রাণিত হয়ে স্বেচ্ছাশ্রমের এই কর্মসূচিতে অংশ গ্রহণ নিয়েছেন। বাংলাদেশে সকল স্তরের জনগণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে কোনও কর্মসূচির বাস্তবায়ন সাধন বাদ পড়েছে অনেক কিশোরও অনুপ্রাণিত হয়ে অংশগ্রহণ করেছিল। এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের ফলে দেশে সেচের মাধ্যমে ফসল উৎপাদন শুরু হয়। শহীদ জিয়া জনগণের হৃদয় স্থান করে নিতে পেরেছিলেন বলেই তিনি দেশের আপামর জনগণকে দেশ গড়ার কাজে উদ্বুদ্ধ করতে পেরেছিলেন।

শহীদ জিয়ার ১৯ দফার একটি অন্যতম দফা ছিল ‘দুর্নীতিমুক্ত ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা কায়েম করা।’ দেশের স্বাধীনতার পরের প্রায় সাড়ে তিন বছরের শাসনামলে সমাজের প্রতি ক্ষেত্রেই দুর্নীতি ব্যাপক রূপ নিয়েছিল। দেশ শাসনে অব্যবস্থা আর দুর্নীতি একাকার হয়ে গিয়েছিল। ১৯৭৪-৭৫ সালে দেশে মোট খাদ্য সাহায্যই এসেছিল ৫১ কোটি মার্কিন ডলারের উপর। দেশে তখনকার জনসংখ্যা ছিল ৭ কোটি ৬৩ লাখ, তাই মাথাপিছু খাদ্য সাহায্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ৬.৭ মার্কিন ডলার। অন্যদিকে ১৯৮১ সালে প্রায় ৯ কোটি লোকের জন্য খাদ্য সাহায্য এসেছিল ২৫ কোটি মার্কিন ডলারের সমমূল্যের, যা জনপ্রতি ২.৮ মার্কিন ডলার। ১৯৭৪-৭৫ সালে ১৯৮১ সালের তুলনায় জনপ্রতি খাদ্য সাহায্যের পরিমাণ ২.৪ গুণ হওয়া সত্ত্বেও সরকারের সীমাহীন দুর্নীতি ও খাদ্য বিতরণে অব্যবস্থার কারণে লাখ লাখ লোক অনাহারে মারা গিয়েছিল।

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়া দেশের উন্নয়নে যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন তার প্রমাণ আগের সরকারের আমলের তুলনায় জিডিপি তাঁর আমলে ৩.৩৩ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছিল। একটি দেশপ্রেমিক, সৎ ও যোগ্য নেতৃত্বে দেশ পরিচালনা হয়েছিল বলে তা সম্ভব হয়েছিল। শহীদ জিয়া একটি আশাহীন জাতিকে দিকনির্দেশনা ও অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিলেন বলেই দেশের জনগণের হৃদয়ের মণিকোঠায় চিরদিন তাঁর নাম উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।

প্রেসিডেন্ট জিয়া বাংলাদেশকে যখন উন্নয়নের পথযাত্রায় বহুদূর এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন, তখনই ১৯৮১ সালের ৩০ মে আধিপত্যবাদী শক্তি ও তাদের দোসর দেশীয় কুচক্রীদের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে তিনি শাহাদাতবরণ করেন। দেশ হারালো সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তানদের একজনকে। শহীদ জিয়ার শাহাদাতের মাধ্যমে আমাদের এই প্রায় মাতৃভূমির যে অপূরণীয় ক্ষতি হলো তা কোনোদিনই পূরণ হবে না। তবে আমরা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়ার প্রদর্শিত পথ ধরে এই দেশ উন্নয়নের জন্য সম্মিলিতভাবে কাজ করলে একদিন যেমন শহীদ জিয়ার উন্নয়নের রাজনীতি এগিয়ে যাবে অন্যদিকে এই মহান নেতার স্মৃতির প্রতি যথার্থ শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করা সম্ভব হবে।

২০০১ সালের অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচিন জনগনের নীরব ভোট বিপ্লবের মাধ্যমে শহীদ জিয়ার যোগ্য উত্তরসূরি দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন জোট দুই-তৃতীয়াংশের বেশিসংখ্যক আসন নিয়ে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করেছে। বর্তমান সরকার ইতোমধ্যে দেশের শিক্ষা, আইন-শৃংখলা, অর্থনীতি, পরিবেশ, যোগাযোগ, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বেশ উন্নয়ন সাধন করেছে। এই উন্নয়নের ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক বছরের ভেতরই বাংলাদেশ বিশ্ব দরবারে সত্যিকারভাবেই একটি ‘আত্ম-প্রত্যয়ী ও আত্ম-মর্যাদার দেশ’ হিসেবে পরিচিত হবে বলে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদাত বার্ষিকীতে আমরা প্রতিজ্ঞা করি, আমাদের বাংলাদেশকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য আমরা সবাই মিলে কাজ করবো। তাহলেই শহীদ জিয়ার স্মৃতির প্রতি সবচেয়ে বড় সম্মান প্রদর্শন করা হবে।

No comments: