সৈয়দ আশরাফ আলী
বাংলাদেশ একটি মুসলিম দেশ। ইসলামকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয় এদেশের আপামর জনসধারণের ধ্যান-ধারণা, চিন্তা-চেতনা আশা-আকাঙ্ক্ষা। স্বভাবতই শতকরা ৯০ ভাগ মুসলিম-অধ্যুষিত বাংলাদেশে ইসলামের প্রভাব যেমন প্রশ্নাতীত তেমনি জনজীবনে ইসলামী আদর্শ-ঐতিহ্যের অনুসরণও একটি স্বাভাবিক বিষয়। আমাদের জীবনাচার, শিক্ষা-সংস্কৃতি, উৎসব-অনুষ্ঠান তথা কর্মক্ষেত্রের প্রতিটি অঙ্গনে ইসলামের বিপুল প্রভাব বিদ্যমান। কিন্তু অপ্রিয় হলেও একথা সত্য যে, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে প্রণীত জাতীয় সংবিধানে যে চারটি রাষ্ট্রীয় মূলনীতি গৃহীত হয় তাতে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশীর অভিমত অগ্রাহ্য করে ধর্মনিরপেক্ষতাকে অন্তর্ভূক্ত করা হয়। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত তৎকালীন সরকার ও সরকারি দল জেনেশুনেই এ কাজটি করেছিলেন। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে এর বিরুদ্ধে তেমন কোনও সোচ্চার প্রতিবাদ ধ্বনিত হয়নি ঠিকই( কিন্তু এ দেশের ইসলাম অনুসারী জনগণ যে এ পদক্ষেপে ভীষণ ক্ষুদ্ধ হয়েছিলেন সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। পরবর্তী পর্যায়ে তৎকালীন সরকার প্রধানও বিষযটি সম্ভবত কিছুটা হলেও অনুধাবন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। হয়ত তারই পটভূমিতে তিনি ১৯৭৪ সালে ইসলামী সম্মেলন সংস্থার বৈঠকে যোগ দিতে লাহোর গমন করে সে ক্ষোভ কিছুটা হলেও প্রশমিত করার চেষ্টা করেছিলেন। তা সত্ত্বেও ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতির অন্যতম হিসাবে গ্রহণের বিসয়টি যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছিল। তা আদৌ অপসৃত হয়নি। তাঁর সে প্রয়াস আদৌ সফল হয়নি। এ দেশের মানুষ ধর্মভীরু। এর কারণ তারা মনে-প্রাণে ইসলামকে ভালবাসে। তারা ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি পছন্দ করে না, কিন্তু তথাকথিত সিকিউলিয়ারিজম-এর নামে তারা ধর্মহীনতাকেও বরদাশত করে না। উদারতা ও সম্প্রীতির আবহমান কালের প্রবাহিত ধারাটির ব্যত্যয় ছিল তাই স্বাভাবিকভাবেই অনাকাঙ্খিত।
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সংঘটিত সিপাহী-জনতার অভূতপূর্ব বিপ্লব স্বাধীনতার ঘোষক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমানকে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে স্থপিত করে। এটি ছিল অপরিহার্য। সময় ও যুগের দাবী। নেতৃত্বের সহজাত গুণাবলীর অধিকারী, শান্ত ও প্রাণবন্ত ধৈর্যশীল ও বেগবান, দূরদর্শী ও বিচক্ষণ জিয়াউর রহমান ছিলেন একনিষ্ঠ ধর্মনুরাগী। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ইসলামের প্রতি সুগভীর শ্রদ্ধা ও ভালবাসার বিষয়টি তিনি সম্যকরূপে অবহিত ছিলেন। ইসলামী আদর্শ-ঐতিহ্যের ধারাটি যে এ দেশের জনজীবনে স্বতঃসলিলা ফল্গুধারার মতই প্রবহমান(সে বিষয়ে তিনি ছিলেন সচেতন। স্বভাবতই, রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে আসার পর অন্যান্য নানাবিধ বিষয়ের পাশাপাশি ধর্মীয় দিক ও বিষয়ের প্রতিও তিনি সবিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। এক কথায় বলা যায়, স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে ইসলামপ্রিয় জনগণের মনের চাপা ক্ষোভকে বিদূরিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন তিনিই। এক্ষেত্রে তাঁর প্রধান ও যুগান্তকারী মানুষের আন্তরিক ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটিয়ে সংবিধানের প্রস্তাবনায় ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ পবিত্র কালামটি সন্নিবেশিত করা। পরবর্তীতে পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের প্রস্তাবনার দ্বিতীয় প্যারা। নিম্নরূপভাবে পুনরুল্লিখিত হয়ঃ
“আমরা অঙ্গীকার করিতেছি যে, যে সকল মহান আদর্শ আমাদের বীর জনগণকে জাতীয় স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধে আত্মনিয়োগ ও বীর শহীদদিগকে প্রাণোৎসর্গ করিতে উদ্বুদ্ধ করিয়াছিল সর্বশক্তিমান আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস, জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র এবং সমাজতন্ত্র অর্থাৎ অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুবিচারের সেই সকল আদর্শ এই সংবিধানের মূলনীতি হইবে।”
এখানে উল্লেখ্য যে, ১৯৭২ সালে প্রণীত সংবিধানের এই প্যারায় বর্ণিত ‘ধর্ম-নিরপেক্ষতা’ শব্দের পরিবর্তে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান “সর্বশক্তিমান আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস” এই শব্দগুলো সংস্থাপন করেন। তাঁর এই পদক্ষেপের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট জিয়া একদিকে যেমন সকল বিভ্রান্তির অপনোদন ঘটান, অন্যদিকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রসত্তার প্রাণ-কাঠামোতে দেশের জনগণের আন্তরিক ইচ্ছাটিই প্রতিফলিত করেন। এ ঐতিহাসিক প্রয়াস যে একটি অতীব যৌক্তিক, বিচক্ষণ ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত ছিল, সময়ের ব্যবধানে তা’ স্বীকৃত হয়েছে। এই যুগান্তকারী পদক্ষেপের ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের দেশ হয়েও ধর্মনিরপেক্ষদেশ হওয়ার অস্বস্তি থেকে বাংলাদেশ মুক্ত হয়, চিরতরে অবসান ঘটে ধর্মনিরপেক্ষাতার।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সাথে দেশের জনগণের বৃহত্তর অংশের হৃদয়ের সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল। তার পিছনে ছিল মানুষের প্রতি তাঁর সুগভীর ভালবাসা এবং মমত্ববোধ। দ্রুত পরিবর্তনশীল সময় ও সময়ের দাবীকে তিনি কখনোই উপপেক্ষা করেননি। জন-জীবনের স্পন্দনকে অনুভব করে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের বিষয়ে তিনি সর্বদাই ছিলেন সচেতন ও সচেষ্ঠ। সে কারণেই প্রচলিত আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন ও ছাত্র-ছাত্রীদের মেধার বিকাশে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ তিনি গ্রহণ করেছিলেন। শিক্ষাঙ্গনে লেখাপড়ার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে সচেষ্ট হয়েছিলেন। সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থও বরাদ্দ করেন। এর পাশাপাশি তিনি লক্ষ্য করেছিলেন যে, স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে ইসলামী শিক্ষার ঐতিহ্যবাহী মাধ্যম মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা প্রচণ্ড অবহেলা ও উপেক্ষার শিকার। ফলে মাদ্রাসা শিক্ষার পূর্ণ মর্যাদা দান এবং সরকারী অনুদান প্রদানের ব্যবস্থা করেন তিনি। শুধু তাই নয়, মাদ্রাসা শিক্ষার জন্য গঠিত মাদ্রাসা বোর্ডকেও তিনি পুনর্গঠন করেন। সুতরাং এ কথা নির্দ্বিধায় স্বীকার্য যে, এ দেশের ইসলামী শিক্ষার ক্ষেত্রে নেমে আসা বিপর্যয় রোধে তিনিই প্রথম উদ্যোগ নিয়েছিলেন এবং এ ক্ষেত্রে নতুন প্রাণ প্রবাহ সঞ্চার করেছিলেন। অন্যকথায় বলা যায়, স্বাধীন বাংলাদেশে একটি বিশেষ মহলের চক্রান্তে মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থাকে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যার যে নীলনকশা প্রণীত হয়েছিল, তিনি তা থেকে তাকে রক্ষা করেন। যুগান্তকারী ঐ প্রয়াস গৃহীত না হলে হয়ত বাংলাদেশের মাদ্রাসা শিক্ষা শুধু ইতিহাসেরই অংশ হয়ে যেত।
স্বৈরাচার বা একদলীয় শাসনতন্ত্র ইসলাম কোনদিনই সমর্থন করে না। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান একটি গণতন্ত্রহীন দেশের কর্ণধার নিযুক্ত হওয়ার পর এ বিশেষ দিকের প্রতিও তাঁর দৃষ্টি আকর্ষিত হয়। ১৯৭৫ সালে দেশের সকল রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করে গণবিমুখ একদলীয় বাকশালী ব্যবস্থা চালু করা হয়। সে দিনগুলোতে বাক স্বাধীনতা, রাজনৈতিক মত প্রকাশের কোনা স্বাধীনতা ছিল না। এক দল, এক ব্যক্তির শাসনে গোটা দেশ এক জিন্দানখানায় পরিণত হয়েছিল। জিয়াউর রহমান ছিলেন সেই দুঃসহ অবস্থার প্রত্যক্ষদর্শী। ক্ষমতায় আসার পরপরই তিনি গণতন্ত্রের দরজা উন্মুক্ত করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি উপলব্ধি করেন, গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে হলে অবশ্যই মত ও পথের শতফুল ফুটতে দিতে হবে। এই লক্ষ্য ও মানসেই তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্রের চর্চা শুরু করার সুবিধার্থে ১৯৭৬ সালে ‘রাজনৈতিক দল বিধি-১৯৭৬’ জারি করেন। এর ফলে দেশে সকল রাজনৈতিক দলের পুনরুজ্জীবন লাভের সুযোগ ঘটে। এ প্রক্রিয়ায় ১৯৭৬ সালের ৪ নভেম্বর বৈধ রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ স্বীকৃত লাভ করে এবং আবদুল মালেক উকিল, মিজানুর রহমান চৌধুরী, বেগম সাজেদা চৌধুরী, ডঃ কামাল হোসেন প্রমুখ দলের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৭৯ সালের ৬ এপ্রিল পঞ্চম সংশোধনী কার্যকর হলে দেশে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু হয়। এ পর্যায়ে পরবর্তী শাসনামলে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে জারিকৃত বিধিটিও বাতিল হয়। জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ, নেজাম-ই-ইসলামী, ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ প্রভৃতি ইসলামপন্থি রাজনৈতিক দল রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার দীর্ঘ-প্রতিক্ষিত সুযোগ লাভ করে। এ পদক্ষেপের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান একটি গণতান্ত্রিক সমাজে বহু দল ও মতের লোক থাকে, বহুশাখ মতামতের উন্মেষ ঘটে(এই সত্যের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধাবোধের পরিচয় দেন।
ইসলামের মহান আদর্শের প্রচার ও প্রসারের জন্য গঠিত দেশের একমাত্র সরকারী দ্বীনী প্রতিষ্ঠান ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ-এর আজকের সুবিশাল পরিসর, সুবিস্তৃত কর্মকাণ্ড এবং সহস্রাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মচাঞ্চল্য(এ সবের স্থপতি হচ্ছেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। ১৯৭৫ সালের মার্চ মাসে এক অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে তৎকালীন ইসলামী একাডেমী ও বায়তুল মোকাররম সোসাইটিকে একীভূত করে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ-এর প্রতিষ্ঠা হলেও ১৯৭৯-৮০ সালের পূর্বে এ প্রতিষ্ঠানটির বিশেষ কোন অগ্রগতি সাধিত হয়নি। বিষয়টি ইসলাম-দরদী শহীদ জিয়ার নজরে পড়ে। ফলে ১৯৭৮ সালে গৃহীত দ্বিবার্ষিক পরিকল্পনার আওতায় চারটি বিভাগীয় সদরে ইসলামী সাংস্কৃতিক কেন্দ্র স্থাপন করে তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কর্মকাণ্ডকে বিভাগীয় পর্যায়ে সম্প্রসারিত করেন। একই সময়ে বায়তুল মোকাররম মসজিদের সৌন্দর্য বৃদ্ধিকরণ ও ইসলামী পুস্তক প্রকাশের নিমিত্ত পৃথক দুটি প্রকল্পও গ্রহণ করা হয়।
এ ধারাবাহিকতায় ১৯৮০-৮১ সালে গৃহীত দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার আওতায় পনের কোটি টাকার নয়টি প্রকল্প ইসলামিক ফাউন্ডেশনের জন্য গৃহীত হয়। এ সব প্রকল্পের মধ্যে ছিল ইমাম প্রশিক্ষণ প্রকল্প, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রকাশনা কার্যক্রম প্রকল্প, বৃহত্তর ১৭টি জেলায় ইসলামী সাস্কৃতিক কেন্দ্র স্থাপন প্রকল্প, গ্রামের মসজিদগুলোকে মসজিদে নববীর আদলে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে মসজিদ পাঠাগার প্রকল্প, সংক্ষিপ্ত দুই খণ্ডসহ বৃহত্তর পঁচিশ খণ্ডে বাংলা ভাষায় ইসলামী বিশ্বকোষ সংকলন ও প্রকাশনা, বায়তুল মোকাররম মসজিদ সম্প্রসারণ প্রকল্প এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশনের জন্য একটি স্বয়ং সম্পূর্ণ ছাপাখানা স্থাপন প্রকল্প।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সদিচ্ছা ও সিদ্ধান্তে গৃহীত এসব প্রকল্প ইসলামিক ফাউন্ডেশনে বাংলাদেশকে দেশের ধর্মপ্রাণ জনগণের হৃদয়ের কাছাকাছি নিয়ে যায়। ফলে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ আজ দেশের ইসলাম-অনুরাগী জনগণের প্রিয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। শহীদ জিয়ার দিক-নির্দেশনায় সেদিন এসব প্রকল্প গৃহীত হয়েছিল বলেই ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পক্ষে এ পর্যন্ত প্রায় পঞ্চাশ হাজার ইমামকে প্রশিক্ষণ প্রদান করা সম্ভব হয়েছে এবং তাঁরা তাদের প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান কাজে লাগিয়ে দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছে। ফলে ইউনিসেফ, ইউএনডিপি, ইউএনএফবি, ইউএস এইড প্রভৃতি আন্তর্জাতিক সংস্থা ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ইমাম প্রশিক্ষণের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ ইসলামী প্রকাশনা কার্যক্রম প্রকল্পের আওতায় এ পর্যন্ত দুই হাজার শিরোনামের পুস্তক প্রকাশ করতে সক্ষম হয়েছে। দশ হাজারেরও বেশি মসজিদ পাঠাগার স্থাপিত হয়েছে এবং আটাশ খণ্ডে ইসলামী বিশ্বকোষ প্রকাশিত হয়েছে। ১৯৭৯ সালে গৃহীত দ্বি-বার্ষিক পরিকল্পনা এবং ১৯৮০-৮১ সালে গৃহীত দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার আওতায় শহীদ জিয়া ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অগ্রগতি ও উন্নয়নের যে বীজ অংকুরিত করেছিলেন, আজকের এ অর্জন তারই ফল।
ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের স্বপ্নদ্রষ্টাও শহীদ জিয়া। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতায় ‘ধর্ম বিভাগ’ নামে একটি পৃথক বিভাগ তিনিই প্রতিষ্ঠা করেন, যা আজকে একটি পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রণালয়ে রূপান্তরিত হয়েছে।
স্বাধীনতার পর থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য কোনও সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। এ সময়কালের উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, মুসলিম বিশ্বের সাথে দীর্ঘদিন বাংলাদেশের ব্যাপক ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপিত হয়নি। বিশেষ করে সৌদী আরবসহ প্রভাবশালী মুসলিম দেশগুলো তখনও বাংলাদেশের ব্যাপারে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করছিল। এর প্রধান কারণ ছিল, শক্তিশালী মুসলিম দেশ হিসেবে পাকিস্তানের সাথে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকায় বাংলাদেশ সম্পর্কে বিরুদ্ধ প্রচারণায় তারা প্রভাবিত হয়। অন্যদিকে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর থেকে রুশ-ভারত বলয়ের আওতায় পরিচালিত হওয়ায় এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি এ দু’টি দেশের দ্বারা পরোক্ষভাবে প্রভাবিত হওয়ায় মুসলিম দেশসমূহ বাংলাদেশের উপর আস্থা রাখতে পারছিল না। বিরাজমান এই সঙ্কটময় অবস্থার পটভূমিতেই প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহামন পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটাতে সচেষ্ট হন। ইসলামী বিশ্বের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন করার লক্ষ্যে তিনি সৌদি আরব, ইউ এ ই, ইরান, পাকিস্তান, মালি, সেনেগাল, সিরিয়া, তুরস্ক প্রভৃতি দেশ সফর করেন। জিয়াউর রহমান ভাল করেই জানতেন যে সুদূর অতীতকাল থেকে বাংলাদেশের সাথে ইসলামী বিশ্বের সুগভীর যোগসূত্র রয়েছে। বিশেষ করে আরব থেকে নবী করীম (সা)-এর সম্মানিত সাহাবীসহ অন্যান্য ইসলাম প্রচারক এ দেশে এসে ইসলাম প্রচার করেছিলেন এবং তাদের অনেকেই এ দেশে থেকে গিয়েছিলেন। এ কারণেই মধ্যপ্রাচ্যের ঐতিহ্যবাহী দেশগুলোর সাথে রয়েছে বাংলাদেশের হাজার হাজার বছরের পুরনো সম্পর্ক। এ বিষয়টি সম্পর্কে সম্যকরূপে অবহিত ছিলেন বলেই জিয়াউর রহমান একবার বলেছিলেন, “বাংলাদেশ হচ্ছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া তথা এশিয়ার সঙ্গে ইসলামের সেতু বনন্ধন।” ইসলামী বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা, উন্নয়ন ও ঘনিষ্ঠ করার তিনি যে প্রয়াস গ্রহণ করেন তা ছিল নিখাদ আন্তরিকাতামণ্ডিত। ইসলামী বিশ্বের সকল ঘটনাপ্রবাহ ও কর্মকাণ্ডের সঙ্গেই তিনি নিবিড়ভাবে সর্ম্পক্ত ছিলেন। মুসলিম দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষার ব্যাপারেও তিনি ছিলেন সচেতন ও আপোসহীন। এ কারণে ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামী বিপ্লবের পর তেহরানস্থ মার্কিন দূতাবাসে প্রায় সাড়ে চার শ’ মার্কিন নাগরিকের জিম্মি করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইরানের বিরুদ্ধে জাতিসংঘ নিষেধাজ্ঞা আরোপের যে উদ্যেগ নেয়, যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের ব্যক্তিগত চাপ সত্ত্বেও জিয়াউর রহমান তার প্রতি সমর্থন দেননি। বজ্রদীপ্ত বলিষ্ঠ-ও অকুতোভয় নেতা বলেই তাঁর পক্ষে এ অসাধ্য সাধন সম্ভব হয়েছিল। অন্যদিকে ইরাক-ইরান যুদ্ধ বন্ধে জিয়াউর রহমানের প্রচেষ্টার কথা বিশেষ উল্লেখের দাবী রাখে। এ যুদ্ধ বরে জন্য ইসলামী সম্মেলন সংস্থা (ওআইসি) গঠিত শান্তি মিশনের সদস্য নির্বাচিত হয় বাংলাদেশ। মুসলিম বিশ্বে তাঁর ইমেজের কারণেই তা সম্ভব হয়েছিল। ঐ মিশনের সর্বাপেক্ষা সক্রিয় সদস্য হিসেবে তিনি বাগদাদ ও তেহরানে যান। এই রক্তক্ষয়ী ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধ বন্ধে তিনি নিশ্চিতরূপে সফলও হতেন। কিন্তু তাঁর আকস্মিক শাহাদাত তাতে বাদ সাধে। মুসলিম উম্মাহার মঙ্গলার্থে তাঁর অসাধারণ ভূমিকার স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৮১ সালে ওআইসি’র সম্মেলনে বাংলাদেশকে সংস্থার অন্যতম সহ-সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। শুধু তাই নয়, শহীদ জিয়ার সুযোগ্য নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ সে সময় ১৫ সদস্যবিশিষ্ট জেরুযালেম কমিটি, ৬ সদস্যবিশিষ্ট জাতিসংঘের জেরুযালেম সমন্বয় কমিটি, ৩ সদস্যবিশিষ্ট আল কুদস কমিটি ও ৩ সদসস্যের ইরান-ইরাক কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হয়।
সর্বকালের সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব হযরত মোহাম্মদ (সা)-এর একনিষ্ঠ অনুসারী মর্দে মু’মিন জিয়াউর রহমান ছিলেন কাজের মানুষ(তিনি যা’ বলতেন, তা নিজে করে দেখাতেন। ইসলামী-দরদী এই মহান নেতার অবিস্মরণীয় অভিলাষ ছিল “বাংলাদেশ ইসলামী রাষ্ট্রসমূহের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করতে চায়, কারণ তাদের সঙ্গে আমাদের ধর্মীয়, ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বন আছে।” প্রজাপতির পাখার মতো বর্ণাঢ্য তাঁর বহুমুখী কর্মকাণ্ড প্রমাণ করে যে, মুসলিম বাংলাদেশের স্বপ্ন-পুরুষ জিয়াউর রহমান শুধু স্বপ্নই দেখেননি, যা বলেছেন তা কাজেও পরিণত করেছেন।
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
No comments:
Post a Comment