জাতীয়তাবাদী জিয়া

আজ থেকে ৯০ বছর পূর্বে উত্তরবঙ্গে যে সাহিত্য সম্মেলন হয়েছিল, সেই সম্মেলনে সভাপতি তাঁর ভাষণে বলেছিলেন, যারা বাংলার মাটি এবং বাংলার আবহাওয়া থেকে শক্তি সঞ্চয় করেন, সুজলা সুফলা শস্যশ্যামলা বাংলাকে যারা মাতৃসম শ্রদ্ধা করেন, বাংলা ভিন্ন যারা অন্য কোন দেশকে গুরুত্ব দেন না বাংলাকেই যারা সবার ঊর্ধ্বে স্থান দেন তারাই প্রকৃত অর্থে বাঙালি এবং এই বাঙালিদের ভাষাই হচ্ছে বাংলা। রংপুর সাহিত্য পরিষদের এবং বগুড়া উত্তরবঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনের সভাপতি পণ্ডিতরাজ যাদবেশ্বর তর্করত্নের এই বক্তব্যে ‘বাঙালি’ এবং বাঙালি চরিত্রের একটি সুস্পষ্ট চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। অর্থাৎ বলা হয়েছে যে, যিনি বাঙালি হবেন তিনি নিজের ভূখণ্ডের সার্বিক স্বার্থকে সর্বাধিক প্রাধান্য দিবেন। নিজ ভূখণ্ডের সার্বিক উন্নয়নে জান প্রাণ দিয়ে কাজ করবেন। নিজ ভূখণ্ড বা দেশের মর্যাদা বৃদ্ধির লক্ষ্যে নিজেকে উৎসর্গ করবেন এবং এটিই হবে বাঙালি চরিত্র। কিন্তু আমাদের বাংলাদেশে যারা বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা, যারা নিজেদের বাঙালি বলে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করেন তারা ঠিক এর উল্টো কাজটিই করেন। তারা জাতীয় স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিতে কুণ্ঠাবোধ করেন না। নিজ দেশের বিরুদ্ধে, দেশের মানুষের বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা করে দেশে এবং বিদেশে দেশের ভাবমূর্তি বিনষ্ট করতে লজ্জাবোধ করেন না। অর্থাৎ তাদের মধ্যে জাতীয়তাবোধ কাজ করে না। তারা গণতন্ত্র হত্যাকারী। তারা বাক-স্বাধীনতা হরণকারী। তারা দুর্ভিক্ষ সৃষ্টিকারী, তারা তলাবিহীন ঝুড়ির রূপকার তথা সম্পদ লুণ্ঠনকারী। বাঙালি পরিচয়দানকারী, বাঙালী জাতীয়তাবাদীদের এহেন ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের কারণেই জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপি’র আবির্ভাব ঘটেছে বাংলাদেশে। এর প্রবক্তা এবং প্রতিষ্ঠাতা হচ্ছেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। ১৯৭১ সালে বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশ স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্থান লাভ করার পর থেকে বেশ কয়েক বছর বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের দ্বারা দেশ শাসিত হয়। তাদের শাসনামলে ব্যাপক লুণ্ঠন, ধ্বংসযজ্ঞ, হত্যা এবং বাকশাল সৃষ্টির কারণে দেশের সার্বিক পরিস্থিতির অভাবনীয় অবনতি ঘটে। দেখা দেয় বিশৃংখলা। দেশের এরূপ নাজুক পরিবেশে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সেনা অভ্যুত্থানের কারণে শেখ মুজিব সপরিবারে নিহত হন। এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে যে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদেরই ইন ছিল তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে পরবর্তী সরকার গঠনের মাধ্যমে (হাজার বছরের বাংলাদেশ, পৃ. ১৪৯)। এরপর বারকয়েক ক্ষমতা দখল এবং পাল্টা দখলের নাটক মঞ্চস্থ হয় এং এই সময় তৎকালের সেনাবাহিনী প্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে বন্দী করা হয়। এই কাজে নেতৃত্ব দেন ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ। কিন্তু খালেদ মোশাররফের এই প্রচেষ্টাকে দেশপ্রেমী সিপাহী-জনতা ব্যর্থ করে দেন। জেনারেল জিয়া মুক্ত হন। নিহত হন খালেদ মোশাররফ।

মুক্ত হয়ে জেনালের জিয়া জাতির উদ্দেশ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেন এবং পুনরায় সেনাবাহিনী প্রধানের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। এরপর অতিদ্রুত দেশের অরাজক পরিস্থিতিই তাকে ক্ষমতাসীন করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। আর এ জন্যই ড. মোহাম্মদ হান্নান লিখিত এবং মফিদুল হক ও আখতার হুসেন সম্পাদিত ‘হাজার বছরের বাংলাদেশ ইতিহাসের অ্যালবাম’ নামক গ্রন্থে বলা হয়েছে, “বন্দীদশা থেকে বীর হয়ে বেরিয়ে আসেন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। জিয়া ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার সঙ্গে জড়িত হয়েছিলেন এমন কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বলা চলে, এই অভ্যুত্থান ঘটনার ভেতর দিয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতা আপনা আপনি তাঁর হাতের মুঠোয় চলে আসে। এ সুযোগ হাতছাড়া করার কোন উপায়ও ছিল না তাঁর।” (পৃ.১৫৭)

উপরের ঊদ্ধৃতাংশ থেকে সুস্পষ্ট যে, আওয়ামী অপশাসন, শেখ মুজিবের সপরিবারে নিহত হওয়া এবং পরবর্তী পর্যায়ের সরকার গঠন, অভ্যুত্থান, পাল্টা অভ্যুত্থানসহ দেশের সার্বিক ভয়াবহ পরিস্থিতিই দেশের দায়িত্ববার গ্রহণে জিয়াকে বাধ্য করেছিল। অর্থাৎ দেশের গণতন্ত্র উদ্ধারের জন্য, বাক-স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেবার জন্য, সর্বোপরি দেশের সার্বিক ভয়াবহ পরিস্থিতিই দেশের দায়িত্বভার গ্রহণে জিয়াকে বাধ্য করেছিল। অর্থাৎ দেশের গণতন্ত্র উদ্ধারের জন্য, বাক-স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেবার জন্য, সর্বোপরি দেশের সার্বিক পরিস্থিতি উন্নয়নের লক্ষ্যে জেনারেল জিয়ার উপর দেশ পরিচলনার ভার অর্পিত হয়েছিল, এবং জেনারেল জিয়া তাঁর শাসনামলে দেশের সার্বিক উন্নয়নে আন্তরিক প্রচেষ্টা চালিয়ে চালিয়ে প্রায় সকল ক্ষেত্রেই সফল হয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ কর্তৃক বন্ধ ঘোষিত সকল রাজনৈতিক দলকে তিনি প্রকাশ্যে রাজনীতি করার অধিকার ফিরিয়ে দেন এবং বাক-স্বাধীনতাসহ সকল প্রকার সুযোগ-সুবিধা দান করেন। তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্বে দেশের শিল্প, সংস্কৃতি, রাজনীতি ও অর্থনীতিসহ সকল ক্ষেত্রেই এভাবে শৃংখলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা পায় এবং দেশ ক্রমান্বয়ে সমৃদ্ধ হতে থাকে। বাংলাদেশের ইতিহাসে জিয়াই প্রথম যিনি রাষ্ট্রপ্রধান হয়েও কোদাল হাতে কৃষক-শ্রমিকের মাঝে মিশে যেতে পেরেছিলেন। যিনি সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে গিয়ে খোঁজ-খবর নিয়ে সমস্যা সমাধানে ভূমিকা পালন করেছিলেন। আর এভাবেই দেশের সকল স্তরের মানুষের আস্থা অর্জনের মাধ্যমে তাদের নিখাদ ভালোবাসায় স্নাত হয়েছিলেন।

রাষ্ট্রনায়ক জিয়া শিল্প-সংস্কৃতির উন্নয়নের জন্যও কাজ করে সকলের আস্থাভাজন হয়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন শিল্প-সংস্কৃতিতে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ হোক। চেয়েছিলেন এ ক্ষেত্রে শুধু দেশেই নয় বিশ্ব দরবারেও বাংলাদেশ স্থান করে নিক। আর এই লক্ষ্যে তিনি চারুকলার উন্নয়নের জন্য ১৯৮১ সালে বাংলাদেশে ‘এশীয় চারুকলা প্রদর্শনী’র আয়োজন করেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন এই প্রদর্শনীর মাধ্যমে দেশের শিল্পীবৃন্দ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মূল শিল্পকর্ম দেখে নিজেদের অভিজ্ঞতাকে সমৃদ্ধ করবেন এবং সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তারা উল্লেখযোগ্য শিল্পকর্ম সৃষ্টির মাধ্যমে দেশে এবং বিদেশে নিজেদের মান-মর্যাদাকে বৃদ্ধি করবেন। জিয়ার এ উদ্দেশ্যও সফল হয়েছে। আজ এই প্রদর্শনীর কল্যাণে বাংলাদেশের অনেক শিল্পী পুরস্কৃত হয়ে দেশে বিদেশে বাংলাদেশের সম্মান যেমন বৃদ্ধি করেছেন তেমনি নিজেরাও হয়েছেন গর্বিত।

১৯৮১ সালে এশীয় চারুকলা প্রদর্শনী উদ্বোধন করে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বলেছিলেন, “ইতিহাস, ঐহিত্য ও চারুকলার ক্ষেত্রে এশীয় দেশসমূহের মধ্যকার সমঝোতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ আরো গভীরতর করার জন্য এই ধরনের প্রদর্শনী আয়োজনের প্রচেষ্টা ভবিষ্যতে অব্যাহত থাকবে। প্রাচ্যের প্রায় সকল দেশ চারুকলার ক্ষেত্রে প্রাচীন ঐতিহ্যের অধিকারী। বিশ্বের সাহিত্য, সংগীত, ভাস্কর্য ও স্থাপত্যের উন্নয়নে প্রাচ্যের সভ্যতাই যথেষ্ট নয়। যথোপযুক্ত জাতীয় ঐতিহ্য ও সংহতি চর্চার মাধ্যমে জাতিসত্তার প্রকৃত ও সার্বিক বিকাশ সম্ভব। এই প্রদর্শনী বিভিন্ন দিক থেকে আমাদের নিকট অত্যন্ত অর্থবহ। আমাদের শিল্পীদের চিন্তা ও প্রতিভার বিকাশ সাধনে সহায়তা করবে এই প্রদর্শনী।” (দৈনিক আজাদ, ৩ জানুয়ারি, ১৯৮১)। প্রেসিডেন্ট জিয়ার এই বক্তব্য যে কতটা আন্তরিক ছিল তা দেশের প্রতিটি শিল্পমনা মানুষ উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছেন। তাঁর এই আন্তরিকতার কারণেই দু’বছর পর পর এশীয় চারুকলা প্রদর্শনী নিয়মিতভাবে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।

প্রেসিডেন্ট জিয়া শিল্পীদের জন্য যে নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন, তিনি যে শিল্পীদের কল্যাণে সুযোগ পেলেই কাজ করেচেন এবং শিল্পীদের সাহায্যে তাঁর হস্ত প্রসারিত করেছেন তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের শহীদ শাহনেওয়াজ ছাত্রাবাসের টিনশেড এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগ। প্রথম এশীয় চারুকলা প্রদর্শনী উপলক্ষে প্রেসিডেন্ট জিয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটে এসে ছাত্রদের ছাত্রাবাসের সিট সমস্যার কথা শুনে তাৎক্ষণিকভাবে অর্থ বরাদ্দ দিয়েছিলেন। যে অর্থের বিনিময়ে তৈরি করা হয়েছিল একটি টিনশেড। ঐ টিনশেডে আজও ছাত্ররা অবস্থান করছে। তাঁর সক্রিয় সহযোগিতায় ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান চারুকলা বিভাগ। তিনি চেয়েছিলেন শুধু ঢাকার নয়, সমগ্র দেশে চারুকলা বিভাগ। একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিক না হলে, সাচ্চা জাতীয়তাবাদী না হলে নিঃস্বার্থভাবে এ সকল উদ্যোগ গ্রহণ করা কারো পক্ষে সম্ভব নয়। তিনি প্রকৃত জাতীয়তাবাদী ছিলেন বলেই বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের আদর্শে তাঁর হৃদয় আলোকিত ছিল বলেই ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে পেরেছিলেন এবং যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে দেশ স্বাধীন করেছিলেন। তাঁর আহ্বানে দেশের সকল স্তরের মানুষ যেমন যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন এবং দেশকে স্বাধীন করতে সাহায্য করেছিলেন তেমনি বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের আদর্শ প্রতিষ্ঠায় তাঁর ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন। তাঁর ডাকে জনগণ সাড়া দেয়ার কারণেই রাজমহলের রাজনীতি ছেড়ে তিনি পথে নেমে এসেছিলেন। সাধারণ গেঞ্জি গায়ে কোদাল হাতে খালকাটা কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং তাঁর শাসনামলে ১৪০০ খাল কাটতে সক্ষম হয়েছিলেন। শুধু খালকাটা নয় স্বদেশ প্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশ ও দেশের জনগণের সার্বিক উন্নয়নে আত্মনিযৈাগ করেছিলেন। তিনি ড্রইং রুমের রাজনীতি পরিত্যাগ করে একজন সাধারণ কৃষক-শ্রমিকের মতো মাঠেঘাটে কাজ করেছেন। ভূমি বিন্যাস ও উন্নয়ন, বীজ, সার, সেচ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। গ্রামীণ শিল্প, তাঁতের উন্নয়ন, পোলট্রি ও খামার প্রতিষ্ঠা এবং তার উন্নয়নে কাজ করেছেন। খাদ্য উৎপাদন দ্বিগুণ করার লক্ষ্যে বন্যা সমস্যার সমাধান, মাছ চাষ ও কৃষি বিপ্লবের প্রতি গুরুত্ব দিয়েছেন। কলকারখানায় তিন সিফটে কাজের ব্যবস্থা করেছিলেন। নিরক্ষরতা দূরীকরণের লক্ষ্যে শিক্ষা বিপ্লবের সূচনা করেছিলেন। এছাড়া পরিবার পরিকল্পনা, যুব জাগরণ এবং মহিলাদের সার্বিক বিষয়ে উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন নব নব মন্ত্রণালয়। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সম্পর্ক উন্নয়নের লক্ষ্যে তিনি সার্ক গঠনের পরিকল্পনা করেছিলেন। মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নেরও প্রচেষ্টা নিয়েছিলেন তিনি। দেশের জন্য আরো অসংখ্য কর্মসূচি তিনি গ্রহণ করেছিলেন যার বর্ণনা এই ক্ষুদ্র পরিসরে তুলে ধরা সম্ভব নয়। এমন একজন মহান জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রনায়কের ২৩তম মৃত্যুবার্ষিকীতে জাতীয়তাবাদী জিয়া সফল রাষ্ট্রনায়ক জিয়া এবং কোটি কোটি মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালবাসায় ধন্য শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়ার প্রতি জানাই আমাদের প্রাণঢালা শ্রদ্ধা ও ভালবাসা।


-ড. আব্দুস সাত্তার

No comments: