রূপকথার নায়ক জিয়াউর রহমান

দীর্ঘকাল ধরে রাজনৈতিক কর্মীসেজে রাষ্ট্রের শীর্ষ নায়ক হওয়ার সাধনা ছিল না জিয়াউর রহমানের। তবে সমাজের একেবারে উচ্চাসনে ওঠার সাধনা তাঁর মোটেই ছিল না( এটা সম্ভবত সত্য নয়। কোন কোন মানুষ ভাগ্যের বরপুত্র হয়ে জন্মায়। প্রচেষ্টার দ্বারা সিঁড়ির পর সিঁড়ি ভেঙে তারা উপরে ওঠেন না(তাই বলে তাঁদের জীবনে কর্মের বা গভীর প্রচেষ্টার ইতিহাস থাকে না তা নয়(জিয়াউর রহমান এ ধরনের এক মহানায়ক। তিনি তকদীরের বরপুত্র, রূপকথার নায়ক( একথা বলা মিথ্যা নয়। কিন্তু একজন শ্রেষ্ঠ মানুষ হওয়ার জন্য প্রকৃতিদত্ত প্রতিভার অধিকারী ছিলেন না একথা সত্য নয়। একজন মানুষের বড় হওযার জন্য যেসব গুনের প্রয়োজন হয় তার বৃহৎ অংশ তাঁর মধ্যে ছিল। সাহসী হওয়া, পরিশ্রমী হওযা, সঙ্কল্পবদ্ধ হওয়া, একাগ্রচিত্ত হওয়া, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভিমুখী হওয়া(এই সব গুণে গুণান্বিত ছিলেন জিয়াউর রহামন। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের সময় তিনি পশ্চিম পাকিস্তানের লাহোর সেক্টরে বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিলেন। আবার ১৯৭১-এ তিনি দেশের মুক্তিসংগ্রামে সৈনাপত্যের ভূমিকা নিয়ে দেশনেতার ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। চট্টগ্রাম থেকে তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্যে বেতারে ভাষণ দিয়েছিলেন। আমি নিজেও তা শুনেছি। এ ভূমিকা দেশপ্রেমিকের, স্বাধীনতা সংগ্রামীর এবং নেতৃস্থানীয় দেশ নায়কের।

ঐতিহাসিক সত্য, তাঁর উদয় ঘটেছিল অনেকটা ধূমকেতুর মতো। রাজনৈতিক নেতাদের মতো তাঁর পরিচয় ছিল না। সে সময় জনপ্রিয়তা নিয়ে তাঁর উত্থান ঘটেনি। পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ বেধে গেলে সৈনাপত্যে বৃত হন জেনারেল ওসমানী। বাংলাদেশের সেনাপ্রধান। কিন্তু রণাঙ্গনে যুদ্ধ পরিচালনার জন্যে মেজর শফিউল্লাহকে দায়িত্ব দেয়া হয়। সে সময় চট্টগ্রামে সেক্টরের দায়িত্বে থাকলেও জিয়াউর রহমানকে বাংলাদেশের সৈন্য পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয়নি। সে দায়িত্ব ন্যস্ত হয় সিপাহীদের প্রিয় মেজর জিয়াউর রহমানের পরবর্তীকালে। এখানে ভাগ্য নয়, সাহসের ভূমিকাই তাঁকে কাঞ্চনজঙ্ঘা শীর্ষে উঠতে সাহায্য করেছে। এখানে যাঞ্ঝা করে তিনি জনপ্রিয়তা অর্জন করেননি। বরং নজরুলের ভাষায় বলতে হয়, জনপ্রিয়তা বা সিপাহীপ্রিয়তা তিনি ছিনিয়ে এনেছিলেন। কূট কৌশলের আশ্রয় নিয়ে নয়, কর্মের যোগ্যতা দিয়ে আর সাহসের অনুপ্রেরণাকে সম্বল করে তিনি এই সৌভাগ্যকে পৃষ্ঠপোষকতা হিসেবে সৃষ্টি করেন। হয়ে ওঠেন রূপকাথার নায়ক। ১৯৭৫-এ তদানীন্তন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হলে জিয়াউর রহমান তকদীর ফেরেশতার আশীর্বাদ পান। বাংলাদেশের সৈনাপত্য তাঁর শিরতাজ হয়ে তাঁকে পরিশোভিত করে। ১৯৭৫-এর নভেম্বরে সিপাহী বিপ্লবে প্রেসিডেন্ট খোন্দকার মোশতাকের অপসৃতি ঘটলে জিয়াউর রহমানের প্রেসিডেন্ট হওযার প্রবল দুর্বলতা যে অতিষ্ঠ নাগরিকদের গড়ে তুলেছিল যারা এক নতুন নেতার আশ্রয় খুঁজছিল। সেই নেতৃত্বের যোগ্যতা জিয়াউর রহমানের মধ্যে ছিল বলে মনে করল সংখ্যাগুরু দেশবাসী। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তদানীন্তন আওয়ামী লীগ সরকারের কাছে দেশের জনগণ যে প্রত্যাশা করেছিল সেই প্রত্যাশানুরূপ দেশ বা রাষ্ট্রকে তারা পায়নি(তার বদলে পেয়েছিল এক মেরুদণ্ডহীন সরকার। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ না করতে পারা সরকার, দারিদ্র্য ও দুর্ভিক্ষদানকারী সরকার্‌ গণতন্ত্রের উচ্ছেদকারী সরকার, জনগণের অপছন্দ বাকশালী সরকার, সংবাদপত্রের নির্দয়ভাবে নির্মূলকারী এক অগণতান্ত্রিক সদ্য স্বাধীনতা পাওয়া এক নব-পরাধীনতা সৃষ্টিকারী সরকার। এই ক্রান্তিকালে মুক্তিদাতা সে নেতৃত্বের সান করছিল জনগণ; মেজর জিয়াউর রহমানের মধ্যে সেই নেতার স্বরূপ তারা দেখতে পায়. তারা, মেজর জিয়াকে জেনারেল জিয়াতে রূপান্তরিত করে এবং ওসমানী ও ভাসানীর মতো নেতারা তাঁকে হাস্যস্ফুরিত ওষ্ঠে ললাটে চুম্বন দিয়ে বরণ করেন। বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদকে জাতীয় জীবনের উজ্জীবন দর্শন করে নায়ক থেকে মহানায়কে উত্তীর্ণ জিয়াউর রহমান। চীফ মার্শাল ল’ এ্যাডমিনিষ্ট্রেটর থেকে উঠে যান প্রেসিডেন্ট হওয়ার সমুচ্চ শিখরে। এই উত্থানের পেছনে আর যে কৌশলী চিন্তা জিয়াউর রহমানকে উদ্বুদ্ধ করে তা হল শতকরা নব্বুই ভাগ মুসলিমের দেশ বাংলাদেশে ইসলামের আদর্শকে অগ্রাধিকার দান। তাঁর বুঝতে দেরী হয়নি সংখ্যাগুরু এই মুসলিমপ্রধান দেশে ইসলামকে উপেক্ষা করা আর আত্মহত্যার পথ বেছে নেওয়া সমান কথা। তাঁরই প্রচেষ্টায় প্রায় ভূলুণ্ঠিত ইসলাম মধ্যাহ্ন সূর্যের দীপ্তি নিয়ে পুনরুদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। জিয়াউর রহমানের জনপ্রিয়তা আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ হয়ে তাঁর হাতে ওঠে। এখানে যে দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন তা থেকেই বোঝা যায় সৈনিক হলেও রাজনৈতিক বুদ্ধিতে জিয়াউর রহমান মোটেও নিম্নমানের ছিল না।

ইসলামের প্রতি গভীর অনুরাগ ও আনুগত্য প্রকাশ করলেও আধুনিক রাজনীতি থেকে তিনি দূরে অবস্থান নেননি। তাঁরই নিরবচ্ছিন্ন চেষ্টার ফলে উপমহাদেশে যে ‘সার্ক’-এর উদ্ভব ঘটে তা উপমহাদেশের অর্থনীতির উন্নতির এক নব-উদ্ভাসিত কৌশল। প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে এটা ছিল মিলন প্রচেষ্টা। এতে তিনি যে নেতৃত্বের অবদান রাখের তাও সামান্য নয়। এই সব কারণে বাংলাদেশের প্রতি যারা ঈর্ষা-দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিল, এই চিন্তাদর্শ যাদের স্বার্থকে ক্ষুণ্ন করছিল(যারা বাংলাদেশকে নিয়ে চক্রান্তের জাল পেতেছিল বৃহৎ মৎস্যের মতো, সে চক্রান্তের জাল ছিঁড়ে বেরিয়ে যাওয়া জিয়াউর রহমানকে যারা সহ্য করতে পারে নি তারাই অপকৌশলের প্রেরণায় জিয়াউর রহমানকে হত্যা করে। এই অপশক্তি জিয়াউর রহমানকে হত্যা করলেও তাকে ‘শহীদ’ হওয়ার সৌভাগ্য তাঁকেই উপহার দেয়। তিনি হয়ে যান চির রূপকথার নায়ক।


-শাহাবুদ্দীন আহমদ

No comments: