ফজলে রাব্বি
বাংলাদেশের সকল মানুষ জানে তিনি কী ছিলেন। এত অল্প সময়ে একজন মানুষ এতখানি জনপ্রিয় হতে পারেন তা কেউ কোনদিন ভাবতে পারেনি। তিনি সত্যই বাংরাদেশের প্রতিটি মানুষের হৃদয় জয় করেছিলেন।
আমি জানি না শহীদ জিয়াউর রহমান কোনদিন ভেবেছিলেন কি না যে, তাঁকে একদিন বাংলাদেশের কাণ্ডারি হতে হবে, গ্রহণ করতে হবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব। প্রথম জীবনে অপর দশজন যুবকের মতো তিনি বেছে নিয়েছিলেন সেকালের সবচেয়ে ভাল দুটি পেশার একটি। তখন চাকরি হিসেবে সামরিক অফিসার অথবা বেসামরিক প্রশাসনিক অফিসার ছিল তরুণদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় চাকরি। তিনি বেছে নিয়েছিলেন সামরিক বাহিনীর চাকরি।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জন্ম হয়েছিল ১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি বগুড়া জেলার বাগবাড়ি গ্রামে। তাঁর বাবার নাম মনসুর রহমান এবং মায়ের নাম জাহানারা খাতুন। তাঁর শৈশব কেটেছে কলকাতায় এবং কৈশর করাচীতে। করাচী থেকেই তিনি ১৯৫২ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে ম্যাট্রিক পাস করেন। কলেজে পড়তে পড়তেই সামরিক বাহিনীতে যোগ দিয়ে কমিশন লাভ কররেন ১৯৫৪ সালে।
আরম্ভ হলো সামরিক বাহিনীর জীবন। প্রথম পর্যায়ে কিছুদিন পশ্চিম পাকিস্তানে থাকার পর ১৯৬৩ সালের দিকে তাঁর নিয়োগ হলো দিনাজপুর। দিনাজপুরে থাকা কালেই তিনি বিবাহ বনে আবদ্ধ হলেন আজকের দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে।
১৯৬৫ সালে কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে আরম্ভ হলো পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের যুদ্ধ। সেই যুদ্ধে পশ্চিম পাকিস্তানের খেমকারান সেক্টরে ‘আলফা কোম্পানী’র একটি ব্যাটেলিয়নের কমান্ডার হিসেবে তিনি সাহসিকতার সঙ্গে যুদ্ধ করে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। এরপর সেখানে কাকুল মিলিটারি একাডেমীর প্রশিক্ষক নিযুক্ত হন। তারপর উচ্চতর সামরিক প্রশিক্ষণের জন্য পশ্চিম জার্মানী যান। জার্মানী হতে ফিরে এসে কিছুদিন ঢাকার কাছে জয়দেবপুরে কাজ করলেন। তারপর ১৯৭০ সালে তাঁকে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অষ্টম ব্যাটেলিয়নের সেকেন্ড ইন কমান্ড করে চট্টগ্রামে বদলি করা হলো।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কথা আমাদের সকলেরই মনে আছে। কী ভয়াবহ রাত। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়েছে নিরস্ত্র জনগণের উপর। আমাদের সকলের মনে প্রচণ্ড ভীতি। আমরা নেতৃত্বহীন অসহায়। এমন সময় ২৭ মার্চ ভোরে চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে ভেসে এসেছিল আমাদের জন্য অভয়বাণী,
‘আমি মেজর জিয়া বলছি’।
এর আগের ঘটনা সম্পর্কে তিনি নিজেই বলেছেন, “এরপর আমি বাংলাদেশে ফিরে এলাম। ১৯৭০ সালের সেপ্টেম্বরে আমাকে নিয়োগ করা হলো চট্টগ্রাম। এবার ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের অষ্টম ব্যাটেলিয়ানের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড। ...... ঘাটি ছিল ষোল শহর বাজারে। ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে এই ব্যাটেলিয়নকে পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল, এর জন্য আমাদের সেখানে পাঠাতে হয়েছিল দু’শ জওয়ানের এক আগামী দল। অন্যরা ছিল একেবারেই প্রথমিক পর্যায়ের সৈনিক। আমাদের যেসব অস্ত্রশস্ত্র দেয়া হয়েছিল, তার মধ্যে ছিল তিনশত পুরানো ৩০৩ রাইফেল, চারটা এলএমজি ও দুটি তিন ইঞ্চি মর্টার। গোলাবারুদের পরিমাণও ছিল নগণ্য। আমাদের এন্টিট্যাঙ্ক বা ভারি মেশিনগান ছিল না।
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে বাংলাদেশে যখন রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিস্ফোরণোন্মুখ হয়ে উঠেছিল, তখন আমি একদিন খবর পেলাম তৃতীয় ব্যাটেলিয়নের সৈনিকরা চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন এলাকায় ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে বিহারীদের বাড়িতে বাস করতে শুরু করেছে। ......
৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ঘোষণা আমাদের কাছে এক গ্রিন সিগন্যাল বলে মনে হলো। আমরা আমাদের পরিকল্পনাকে চূড়ান্ত রূপ দিলাম। কিন্তু তৃতীয় কোন ব্যক্তিকে তা জানালাম না। বাঙালি ও পাকিস্তানী সৈনিকদের মাঝেও উত্তেজনা ক্রমেই চরমে উঠছিল। ১৩ই মার্চ শুরু হলো মুজিব ইয়াহিয়ার আলোচনা। আমরা সবাই ক্ষণিকের জন্য স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। আমরা আশা করলাম পাকিস্তানী নেতারা যুক্তি মানবে এবং পরিস্থিতির উন্নতি হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে পাকিস্তানীদের সামরিক প্রস্তুতি হ্রাস না পেয়ে দিন দিনই বৃদ্ধি পেতে শুরু করলো। ......
১৭ মার্চ স্টেডিয়ামে ইবিআরসি’র লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম আর চৌধুরী আমি, ক্যাপ্টেন ওলি আমহদ ও মেজর আমিন চৌধুরী এক গোপন বৈঠকে মিলিত হলাম। এক চূড়ান্ত যুক্ত পরিকল্পনা গ্রহণ করলাম। লে. কর্নেল চৌধুরীকে অনুরোধ করলাম নেতৃত্ব দিতে। ...
২৪ মার্চ ব্রিগেডিয়ার মজুমদার ঢাকা চলে এলেন। স্যায় পাকিস্তানী বাহিনী শক্তি প্রয়োগে চট্টগ্রাম বন্দরে যাওয়ার পথ করে নিল। জাহাজ ‘সোয়াত’ থেকে অস্ত্র নামানোর জন্যই ছিল ্তাদের এই অভিযান। পথে জনতার সাথে ঘটলো ওদের কয়েক দফা সংঘর্ষ। এতে আহত হলো বিপুলসংখ্যক বাঙালি। সশস্ত্র সংগ্রাম যে কোন মুহূর্তে শুরু হতে পারে, এ আমরা ধরেই নিয়েছিলাম। মানসিক দিক দিয়ে আমরা ছিলাম প্রস্তুত।
তারপর এলো সেই কালো রাত। ২৫শে ও ২৬শে মার্চের মধ্যবর্তী কালো রাত। রাত ১টায় আমার কমান্ডিং অফিসার আমাকে নির্দেশ দিলো নৌবাহিনীর ট্রাকে করে চট্টগ্রাম বন্দরে যেয়ে জেনারেল আনসারীর কাছে রিপোর্ট করতে। ..
এ আদেশ পালন করা আমার পক্ষে ছিল অসম্ভব। আমি বন্দরে যাচ্ছি কি না তা দেখার জন্য একজন লোক ছিল। আর বন্দরে (সশরীর) প্রতীক্ষায় জেনারেল আনসারি। হয়তো বা আমাকে চিরদিনের মতো স্বাগত জানাতে।
এটা ছিল সিদ্ধান্ত গ্রহণের চূড়ান্ত সময়। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আমি বললাম, ‘আমি বিদ্রোহ করলাম। তুমি ষোল শহর বাজারে যাও। পাকিস্তানী অফিসারদের গ্রেফতার করো।’ ওলি আমমদকে বললাম, ‘ব্যাটেলিয়ন তৈরি রাখতে, আমি আসছি।’ .....
আমি কমান্ডিং অফিসারের জিপ নিয়ে তার বাসার দিকে রওয়ানা দিলাম। তার বাসায় পৌঁছে হাত রাখলাম কলিং বেলে। কমান্ডিং অফিসার পাজামা পরেই বেরিয়ে এলো। খুলে দিলো দরজা। ক্ষিপ্রগতিতে আমি ঘরে ঢুকে পড়লাম এবং গলাসুদ্ধ তার কলার টেনে ধরলাম। দ্রুতগতিতে আবার দরজা খুলে কর্নেলকে বাইরে টেনে আনলাম। বললাম( বন্দরে পাঠিয়ে আমাকে মারতে চেয়েছিলে? এই আমি তোমাকে গ্রেফতার করলাম। এখন লক্ষী সোনার মত আমার সঙ্গে এসো।
সে আমার কথা মানলো। আমি তাকে ব্যাটেলিয়নে নিয়ে এলাম। অফিসারদের মেসে যাওয়ার পথে আমি কর্নেল শওকতকে (তখন মেজর) ডাকলাম। জানালাম আমরা বিদ্রোহ করেছি। শওকত আমার হাতে হাত মিলালো।
ব্যাটেলিয়নে ফিরে দেখলাম সমস্ত পাকিস্তানী অফিসারকে বী করা হয়েছে। আমি অফিসে গেলাম। ....”
এরপরের ইতিহাস আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ঘোষণার মাধ্যমে আমাদের যে স্বাধীনতা-যুদ্ধের সূচনা হলো তার পরিসমাপ্তি ঘটলো ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে। নয় মাস যেতে না যেতেই ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে আমরা স্বাধীন হলাম। কয়েক বছর আগে এমনিভাবে যুদ্ধ করেই স্বাধীন হয়েছে আলজিরিয়া ও ভিয়েতনাম। তারা অনেক বছর যুদ্ধ করেছিল। আমাদের ততদিন যুদ্ধ করতে হয়নি।
আমরা স্বাধীন হয়েছি কিন্তু দেশে শান্তি নেই। চারদিকে অরাজকতা। তখন দেশে এক প্রচণ্ড হতাশা বিদ্যমান। কয়েক বছর আগে ১৯৭৪ সালে ঘটে গিয়েছে এক ভীষণ দুর্ভিক্ষ। অসংখ্য মানুষ অনাহারে প্রাণ দিয়েছে। একটা কথা প্রায়ই শোনা যাচ্ছে যে অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশের অস্তিত্ব সংকটজনক। দেশের কোন খনিজ সম্পদ নেই, বিশ্ব বাজারে পাটের চাহিদা কমে গিয়েছে, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, খাদ্য ঘাটতি, বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয় নেই, রাজনৈতিক অবস্থা স্থিতিশীল নয়(এমন এক হতাশাব্যঞ্জক অবস্থা চলছে। এমন এক সংকটকালে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিতে হলো শহীদ জিয়াউর রহমানকে।
তিনি দেশের প্রকৃত অবস্থা জানার জন্য গ্রামে গঞ্জে হাটে মাঠে ঘাটে গিয়েছেন নিজের চোখে দেখেছেন গ্রামের অবস্থা(দেশের অবস্থা। মেঠো পথে হেঁটেছেন মাইলের পর মাইল যা কোনদিন এদেশে এর আগে কোন রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী করেননি। তিনি তাই করেছেন। দেশের মানুষের প্রকৃত অবস্থা জানার এ কী ভীষণ আগ্রহ। এমন দৃশ্য কল্পনা করা যায় না। না, আমাদের এই বাংলাদেশে ক্ষমতায় গিয়ে কেউ কোনদিন এমনিভাবে গ্রামের পথে পায়ে হাঁটেননি। কিন্তু তিনি গ্রামের পথে হাঁটতে হাঁটতে প্রবেশ করেছেন কোন কৃষকের ঘরে, কিষাণীর উনুনের ধারে। তার কুশল জিজ্ঞাসা করেছেন। ঘরের ভেতরে গিয়ে নিজের চোখে দেখেছেন কৃষকের ঘরে কি আছে। কী তার আসবাব, কী তার সম্পদ, কী তার খাদ্য, বস্ত্র ও কী তার মাথার ওপর আচ্ছাদন। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছেন গ্রামের অতি সাধারণ মানুষের প্রকৃত অবস্থা।
দিন-তারিখ মনে নেই। একদিন একটা দাওয়াতপত্র পেলাম। বঙ্গভবনের দাওয়াত। প্রেসিডেন্ট বক্তব্য রাখবেন। আমাদের সেই বক্তৃতা শুনতে হবে। আমরা যথাসময়ে বঙ্গভবনে উপস্থিত হলাম। যারা আমন্ত্রিত হয়েছেন তারা সকলেই সরকারি চাকুরে। বিভিন্ন সংস্থার প্রধান বা মন্ত্রণালয়ের প্রধান। দরবার হল পুরাটাই ভরে গিয়েছে। রাষ্ট্রপতির বক্তৃতা শোনার প্রতি এক এক জনের আগ্রহ এক এক রকমের। দেখলাম মঞ্চের পেছনে বিশাল একটি মানচিত্র। বাংলাদেশের মানচিত্র। সেদিনের সেই বক্তৃতা কোথাও সংরক্ষিত আছে কি না আমার জানা নেই। প্রেসিডেন্ট জিয়া সেদিন দীর্ঘক্ষণ বক্তৃতা দিয়েছিলেন। মাঝখানে রাতের খাবারের জন্য কিছু সময়ের বিরতি ছিল। প্রেসিডেন্ট ভবনে নৈশভোজ। রীতিমত লোভনীয় ব্যাপার। না, খাবারে কোন বাহুল্য ছিল না। সাদা ভাত, একটা নিরামিষ, মুরগির তরকারি, ডাল ও মিষ্টি। শুনেছিলাম প্রেসিডেন্ট সব সময় এমনই খাবার খেয়ে থাকেন। স্বাস্থ্যের জন্যই খাবার, খাবারের জন্য স্বাস্থ্য নয়। জীবন যাপনে তিনি ছিলেন সাদাসিধে, সহজ ও অনাড়ম্বর। বিলাসিতা তিনি পছন্দ করতেন না।
সেদিনের দীর্ঘ বক্তৃতায় তিনি অফুরন্ত সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেছিলেন। আগেই বলেছি, বিশাল একটি বাংলাদেশের মানচিত্রের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি কথা বলছিলেন। এক একবার মানচিত্রের দিকে ঘুরে দাঁড়াচ্ছিলেন। সব কথা আজ মনে নেই, তবে বক্তৃতার সারমর্ম মনে আছে। তিনি বলেছিলেন, আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ আমাদের দেশের মানুষ। এই মানব সম্পদকে কাজে লাগাতে হবে। সেই সঙ্গে রয়েছে মৃত্তিকা ও পানি। মাটির নিচে রয়েছে বিপুল তৈল সম্পদ। প্রথমে মানব সম্পদকে মানব শক্তিতে রূপান্তরিত করতে হবে। আমাদের মানবশক্তি তখন মৃত্তিকা, পানি ও তৈল সম্পদকে কাজে লাগাবে। আমরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাঁর কথা শুনছিলাম। একদিকে কানে আসছিল তাঁর কথা আর অন্য দিকে মানসপটে দেখছিলাম(এই ছোট্ট দেশ বাংলাদেশ এক উন্নত দেশে পরিণত হয়েছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা অথবা রাজশাহী সকল শহরের প্রতিটি পথ প্রশস্ত, ঝকঝকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। বৈদ্যুতিক ট্রেন প্রতি তিরিশ মিনিট পর পর ঢাকা ছেড়ে যাচ্ছে। ও দেশের চার পাশ হতে ঢাকায় প্রবেশ করছে। দেশের প্রতিটি মানুষ শিক্ষিত। প্রতিটি মানুষ দক্ষ। গ্রামগুলির চেহারা বদলে গিয়েছে। প্রতিটি গ্রামে বিদ্যুৎ। গ্রামের ছেলেমেয়েদের চোখে-মুখে হাসি। সুন্দর স্বাস্থ্য। তারা সবাই গ্রামের স্কুলে পড়ে। লাইব্রেরীতে যায়। গ্রামে বসেই তারা সারা দুনিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক রাখে। গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে টেলিফোন, টেলিভিশন ও গাড়ি রয়েছে। কোন ছেলেই আর দেশ ছেড়ে বিদেশে যেতে চায় না।
কী অদ্ভুত তাঁর বাচনভঙ্গি! কী অসাধারণ প্রত্যাশা ও আত্মবিশ্বাস! বাংলাদেশের মানুষের উপর কী অপরিমেয় বিশ্বাস! কে যেন সেদিন বলেছিলেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ভিশন ছিল। সত্যিই তাঁর ভিশন ছিল।
আর একদিন তিনি দেশের নামকরা সব বিজ্ঞানীকে ডাকলেন। তিনি তাঁদের কাছে শুনতে চাইলেন বিজ্ঞানকে কি ভাবে দেশের উন্নতির কাজে লাগানো যায়। তিনি শুনলেন সৌরশক্তির কথা, বায়ু শক্তির কথা, বায়োগ্যাসের কথা। আরও শুনলেন বঙ্গোপসাগরে সমুদ্র-সম্পদের কথা। তিনি বিজ্ঞানীদের বললেন, “আপনারা জাহাজে করে কয়েকদিন সাগরে গিয়ে থাকুন। দেখুন সাগরের কোন সম্পদ কাজে লাগানো যায় কি না।” সত্য সত্যই বিজ্ঞানীদের সমুদ্র ভ্রমণের ব্যবস্থা হলো। তারা সাগরের বিভিন্ন এলাকার পানি ও সাগর তলের মাটি সংগ্রহ করলেন। সংগ্রহ করলেন জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদ। সাগর সম্পদ নিয়ে যদি চলতো গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা তাহলে আজ হয়তো আমরা অনেক এগিয়ে যেতাম।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান মৃত্যুর মাত্র কয়েক মাস আগে মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে হিজবুল বাহার জাহাজযোগে গিয়েছিলেন সমুদ্র সফরে। যে সফরটি ছিল তাদের জন্য শিক্ষা সফর।
আমরা যারা ভাগ্যবান অর্থাৎ যাদের বাবা-মা শিক্ষিত, যাদের বাবা অবস্থাপন্ন তারাই তো ভাল স্কুলে লেখাপড়া করার সুযোগ পেয়ে থাকি। আর একটু কম অবস্থাপন্ন যাদের বাবারা তারাও হয়তো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লেখাপড়ার সুযোগ পায়। আর যারা গরিব, তাদের ছেলেমেয়েরা সবাই কি পারে লেখাপড়া করতে। অশিক্ষিত গরিব, তাদের ছেলেমেয়েরা শৈশবকাল হতেই বাবা-মাকে সাহায্য করার জন্য কাজ করতে আরম্ভ করে। আমাদের দেশের অধিকাংশ বাবা-মা-ই তো গরিব ও অশিক্ষিত। তারা কয়জন নিজের ছেলেমেয়েকে স্কুলে পাঠাতে পারে? পারে না।
রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহনের পর তিনি প্রায়ই বঙ্গভবনে বিভিন্ন শ্রেণীর বুদ্ধিজীবীকে ডাকতেন, তাদের কথা শুনতেন। দেশের বিভিন্ন সমস্যা সম্পর্কে অবহিত হতেন। শুধু তাই নয় বিভিন্ন সমস্যার কি সমাধান হতে পারে সে সম্পর্কে তাদের মতামতও শুনতেন। নিজের চোখে দেখে ও সকলের কথা শুনে তিনি নিজে বাংলাদেশের দুটি সমস্যাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা বলে চিহ্নিত করেছিলেন। একটি বন্যা ও অপরটি অশিক্ষা।
তিনি বুঝতে পেরেছিলেন প্রথাগত আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় এই দুটি সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। দেশের শতকরা প্রায় আশি ভাগ অশিক্ষিত লোককে কেবল সাক্ষরতা দান করতে হলে যে বিপুল অর্থের প্রয়োজন তা আমাদের নেই।
আমরা সকলেই কামাল আতাতুর্কের কথা জানি। কামাল আতাতুর্ককে বলা হয় আধুনিক তুরস্কের পিতা। তিনিও বুঝতে পেরেচিলেন দেশের সকল লোককে শিক্ষিত না করলে দেশের উন্নতি হবে না। দেশের কিছুসংখ্যক লোক শিক্ষিত হবে, দেশ চালাবে, চাকরি করবে, ব্যবসা করবে আর অধিকাংশ অশিক্ষিত লোক তাদের তাবেদারি করবে, এই অবস্থা দেশের জন্য কখনোই মঙ্গলজনক নয়। তাই তিনি প্রথমেই যে উদ্যোগ গ্রহণ করলেন তা হলো দেশের সকল লোককে শিক্ষিত করতে হবে।
জাপানেও একই ঘটনা ঘটেছিল। এক সময় জাপানে তাদের রাজাকে দেবতার সম্মান দেওয়া হতো। তিনি থাকতেন কিওটো শহরে। তার কোন ক্ষমতা ছিল না। সকল ক্ষমতা ছিল সেনাপতির হাতে। তাকে বলা হতো শোগান। তিনি বাস করতেন টোকিওতে। আজ হতে প্রায় দু’শ বছর আগে রাজা হয়েছিলেন মেজি। তিনি আর নিছক দেবতা হয়ে থাকতে চাইলেন না। তিনি তার বুদের সহযোগিতায় টোকিওতে গিয়ে ক্ষমতা ফিরিয়ে নিলেন। রাজা হয়েই তিনি প্রথম যে কাজ করলেন তা হচ্ছে দেশের সমস্ত লোককে শিক্ষিত করার কর্মসূচি গ্রহণ। তিনি ঘোষণা করলেন সমস্ত শিশুকে বিদ্যালয়ে পাঠাতে হবে। কোন শিশু যদি বিদ্যালয়ে না যায় তবে তাদের বাবা-মাকে শাস্তি ভোগ করতে হবে। তাদের জেলে যেতে হবে। আর বিদ্যালয়ের ব্যবস্থা করবে সেই অঞ্চলের জমিদার অথবা যিনি সেই অঞ্চলের নেতা অথবা সবচেয়ে ধনী যে ব্যক্তি তাকে। এজন্য রাজকোষ হতে কোন অর্থ দেয়া হবে না। রাজা কেবল হুকুম দিলেন আর তার পুলিশকে বললেন খেয়াল রাখতে যে কারো ছেলেমেয়ে বিদ্যালয়ে যাচেছ কি না এবং কোন নেতা বা জমিদার বিদ্যালয় তৈরি করছে না বা বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ করছে না। এই সব বিদ্যালয় চালাতে না পেরে লজ্জায় অনেক জমিদার, নেতা ও ধনী ব্যক্তি সেদিন আত্মহত্যা করেছিল। সে এক ভীষণ তুলকালাম কাণ্ড! কোন পরিকল্পনা করার প্রয়োজন হলো না। প্রয়োজন হলো না সরকারি অর্থের। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে জাপানের সমস্ত লোক শিক্ষিত হয়ে গেল। জাপানের লোকেরা ছিল ভীষণ গরিব। সেই গরিব দেশ জাপান আজ পৃথিবীর অন্যতম ধনী দেশ। তার কারণ সে দেশের সমস্ত লোক শিক্ষিত।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানও বুঝেছিলেন দেশের সমস্ত লোককে শিক্ষিত করতে হবে। মৌলিক শিক্ষা লাভের অধিকার রয়েছে প্রতিটি মানুষের, প্রতিটি নাগরিকের। আর আমাদের দেশের অধিকাংশ বয়স্ক লোক অশিক্ষিত। বয়স্ক লোকগুলোকে শিক্ষিত না করতে পারলে তাদের ছেলেমেয়েরা সহজে শিক্ষিত হবে না। প্রথমে সকল বয়স্ককে লেখাপড়া শেখাতে হবে। তাই প্রথমে তিনি ঠিক করলেন সকল মাধ্যমিক পরিক্ষার্থীকে কমপক্ষে একজন নিরক্ষর লোককে সাক্ষর করতে হবে। এই শেখানোর জন্য সে মাধ্যমিক পরীক্ষায় পঞ্চাশ নম্বর বেশি পাবে। প্রতি বছর আমাদের দেশে কয়েক লক্ষ ছেলেমেয়ে মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়ে থাকে। শহীদ জিয়াউর রহমানের বয়স্ক শিক্ষার সেই প্রকল্প যদি আজও চালু থাকতো তাহলে কোন অর্থ ব্যয় না করেই আজ প্রায় কয়েক কোটি বয়স্ক লোককে শিক্ষিত করা যেতো।
তিনি ওইটুকু করেই থেমে থাকেননি। প্রশাসনকে বয়স্ক শিক্ষার কাজে লাগিয়েছিলেন। প্রতিটি জেলায় একজন করে ‘অতিরিক্ত উপ কমিশনার শিক্ষা’ নামে একটি পদ সৃষ্টি করে সেখানে ক্ষমতাশালী অফিসার নিয়োগ করেছিলেন যাতে বয়স্ক শিক্ষা কার্যক্রম যথাযথ কার্যকর হয়। বয়স্কদের জন্য বইও মুদ্রিত হয়েছিল হাজার হাজার কপি।
একদিকে সার্বজনীন শিক্ষা ও বয়স্ক শিক্ষা অন্যদিকে মেধাবী শিশুদেরকে শৈশবেই খুঁজে আনতে হবে, তাদেরকে সাহায্য করতে হবে সে যেন তার মেধার পূর্ণ বিকাশ ঘটাতে পারে। তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন শিশু একাডেমী। টেলিভিশনে চালু করলেন ‘নতুন কুড়ি’ কর্মসুচি। কিশোরদের জন্য টেলিভিশনে ‘জাতীয় বিতর্ক প্রতিযোগিতা’ আমরা বলি, শিশুরাই জাতির ভবিষ্যৎ। কিন্তু ভবিষ্যতের জন্য আমরা কয়টি শিশুকে প্রস্তুত করি? দেশের কত শিশু সুযোগ পায় আপন প্রতিভাকে বিকশিত করতে? সকল শিশু আজই শিক্ষিত হতে পারবে না। সময় লাগবে। তার জন্য যদি অপেক্ষা করতে হয় তাহলে এই অবসরে অনেক শিশু প্রতিভা হারিয়ে যাবে। তাই শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ভাবলেন, না অপেক্ষা নয়। এখনই এমন কিছু করতে হবেযার মাঝ দিয়ে প্রতিভাবান শিশুরা প্রকাশিত হতে পারে। সকলে জানতে পারবে, কোন্ শিশু গাইতে পারে। কোন্ শিশু ছবি আঁকতে পারে। কোন্ শিশু অভিনয় করতে পারে। যখন জানা যাবে এই সকল শিল্পে কোন শিশু অধিকতর পারদর্শী তখন সেই শিশুকে আরো প্রশিক্ষণ দেয়া যাবে। তারা বড় হবে। দেশ-বিদেশে তাদের নাম হবে, বিশ্বসভায় তারা বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করবে। তাই তো তিনি আর বিলম্ব না করেই জাতির ভবিষ্যৎ আমাদের শিশুদের জন্য প্রতিষ্ঠা করলেন ‘শিশু একাডেমী’। টেলিভিশনে চালু করলেন ‘নতুন কুড়ি’ প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতার মাধ্যমে বেরিয়ে আসছিল আমাদের ক্ষুদে শিল্পীরা। আজকের ক্ষুদে শিল্পীরা একদিন বড় হবে। বড় শিল্পী হবে। বড় মানুষ হবে। দক্ষ মানুষ হবে। তাঁর একটি মাত্র ধ্যান ছিল বাংলাদেশের জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তরিত করতে হবে। মানুষই আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ।
এরপর তিনি ভাবলেন বন্যা সমস্যার কথা। বন্যা সমস্যা বাংলাদেশের প্রধান সমস্যা তাতে কোন সন্দেহ নেই। কেবল আমাদের দেশের নয়, বিশ্বের বড় বড় প্রকৌশল সংস্থা আমাদের বন্যা প্রতিরোধের জন্য নানা রকমের পরিকল্পনা পেশ করেছেন। এই সব পরিকল্পনা করতেও বহু অর্থ ব্যয় হয়েছে। সে অর্থও আমরা ঋণ করে ব্যয় করেছি। কিন্তু সেই সব পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করতে প্রয়োজন হাজার হাজার কোটি টাকা। এত টাকা আমরা কোথায় পাবো? ঋণ করে যে সব পরিকল্পনা করেছি সেই ঋণের বোঝা আজ আমাদের বইতে হচ্ছে। কিন্তু কোন পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করা সম্ভব হয়নি।
আমরা সকলেই জানি এশিয়ার তিনটি বিশাল নদী গঙ্গা বা পদ্মা, যমুনা ও মেঘনা আমাদের দেশের মাঝ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সমুদ্র মিশেছে। এই বিশাল তিনটি নদীর সঙ্গে আরো অনেক ছোট নদীও আছে। এই নদীগুলি উত্তর দিকের পর্বতমালা থেকে বরফগলা পানি, বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি ও সেই সঙ্গে প্রচুর পলিমাটি নিয়ে আসে। এই পলিমাটি আমাদের সব কয়টি নদীর তলায় এসে জমতে থাকে। জমতে জমতে এখন নদীর তলা অনেক উঁচু হয়ে গিয়েছে। ফলে যে বছর একটু বেশি বৃষ্টি হয় তখন পানি নদীর দু’কূল ছাপিয়ে মাঠ-ঘাট বাড়ি-ঘর ডুবিয়ে দক্ষিণে সমুদ্রের দিকে ছুটতে থাকে। আর তখনই হয় বন্যা। বড় বড় নদীর তলার মাটি যদি কেটে তোলা যেতো তাহলে নদীর গভীরতা বাড়তো। আর বন্যাও হতো না। কিন্তু এই সব বড় বড় নদীর তলা খনন করা সহজ কাজ নয়। অনেক যন্ত্রপাতি ও অনেক অর্থের প্রয়োজন। প্রায় সকল গ্রামেই অনেক মজা পুকুর আছে, খাল আছে, কিন্তু সেগুলি সবই প্রায় ভরাট হয়ে গিয়েছে। তিনি ভাবলেন, এই সব খাল বিল পুকুর যদি পুনরায় খনন করে গভীর করা যায় তাহলে বর্ষাকালে যে অতিরিক্ত পানি জমির উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বন্যার সৃষ্টি করে সেই পানি এসে এই সব খাল বিল পুকুরে জমা হবে। বন্যা হবে না্ তাছাড়া মাছের বংশ বৃদ্ধির জন্য কাজে লাগবে। তবে এই সব পুকুর খাল বিল কাটতেও তো অনেক টাকার প্রয়োজন। এই টাকা কোথায় পাওয়া যাবে। তিনি একটা উপায় উদ্ভাবন করলেন। বললেন, দেশের মানুষকে উদ্ভুদ্ধ করতে হবে। তিনি সকলকে ডাক দিলেন খাল খননের জন্য। সকলে যদি একদিন দু’দিন শ্রম দেয়, নিজে মাটি কাটে তাহলেই তো হবে। এ কাজ তো অপরের কাজ নয়। নিজের কাজ নিজে করতে লজ্জাই বা কোথায়। তিনি নিজে এগিয়ে এলেন। জনগনের সঙ্গে হাত হাত মিলিয়ে কোদাল দিয়ে মাটি কাটতে আরম্ব করলেন। সাথে সাথে বাংলাদেশের কয়েক কোটি মানুষ কোদাল হাতে ঝাঁপিয়ে পড়লো খাল কাটার কাজে।
তিনি নিজ গিয়েছেন, নিজে কোদাল হাতে মাটি কেটেছেন। সরকারি সকল অফিসার তাঁর সঙ্গে হাত মিলিয়ে খাল কাটার কর্মসূচিতে নেমে পড়েছিল। মানুষকে উদ্ভুদ্ধ করেছেন স্বেচ্ছায় শ্রম দিতে। অগণিত মানুষের স্বেচ্ছা-শ্রমে কাটা হলো উলসিযদুনাথপুর খাল। আরও কত খাল ও মজা পুকুর।
তিনি অন্তরের অন্তস্থল থেকে অনুধাবন করতেন যে, বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামকে স্বনির্ভর করে তুলতে পারলে তবেই সমগ্র বাংলাদেশ স্বনির্ভর হয়ে উঠবে। দেশ স্বনির্ভর হলে বিদেশ হতে আর ঋণ করে টাকা আনতে হবে না। তাই উন্নয়ন আরম্ভ করতে হবে গ্রাম থেকে। গ্রামকে সচেতন করে তুলতে হবে। গ্রামের মানুষকে জাগিয়ে তুলতে হবে। তিনি প্রবর্তন করেন গ্রাম সরকার। গ্রামের মানুষেরা নিজেদের সমস্যা নিজেরাই মিলেমিশে সমাধান করবে। তারা সবাই মিলে নির্বাচন করবে গ্রাম-প্রধান। প্রতিটি জেলায় একটি গ্রামকে আদর্শ-গ্রাম হিসেবে নির্বাচন করা হলো। সেই গ্রামে থাকবে বায়োগ্যাস ও সৌর বিদ্যুৎ। গ্রামকে তিনি চিহ্নিত করলেন সমগ্র দেশের উন্নয়নের কেন্দ্র হিসেবে। গ্রামে যদি শান্তি-শৃঙ্খলা থাকে তবে বাংলাদেশ হবে শান্তির দেশ। তিনি গ্রামের শান্তি রক্ষার দায়িত্ব দিলেন গ্রাম সরকারের উপর। সেখানে গড়ে তোলা হলো গ্রাম প্রতিরক্ষা দল।
গ্রামের সাধারণ মানুষ অজ্ঞতার কারণে নানাবিধ রোগে কষ্ট পায়। বিনা চিকিৎসায় প্রাণ হারায়। চিকিৎসার জন্য যেতে পারে না শহরের বড় ডাক্তারের কাছে। তাদের জন্য তিনি করলেন পল্লীচিকিৎসক। এক বছরে প্রশিক্ষণ দিয়ে গ্রামের একজন আগ্রহী মানুষকে করা হলো পল্লীচিকিৎসক। এরা ছোটখাটো সহজ রোগের চিকিৎসা করতে সক্ষম। তারা আরো শিখলো কি ভাবে রোগ প্রতিরোধ করতে হয়। হাজার হাজার পল্লীচিকিৎসক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে আপন গ্রামে আপনজনের পাশে গিয়ে দাঁড়াবার জন্য এগিয়ে গেল। গ্রামের ছেলে কোন কোন সময় পড়ালেখা শিখে ডাক্তার হয়। কিন্তু তারা গ্রামে ফিরে যেতে পারে না। গ্রামে গিয়ে গ্রামের মানুষের চিকিৎসা সে করতে পারে না। সেটা সম্ভবও নয়। আমরা জানি আজ যারা শহরের বড় বড় মেডিক্যাল কলেজে পড়াশোনা করে ডাক্তার হচ্ছে প্রায় সকলেই গ্রামের ছেলে। কিন্তু তারা ডাক্তারী পাস করার পর আর গ্রামে ফিরে গিয়ে ডাক্তারী করতে পারেন না। আর তাদের সংখ্যাই বা কত? গ্রাম তো হাজার হাজার। প্রতি গ্রামে ডাক্তার দিতে হলে হাজার হাজার ডাক্তার তৈরি করতে হবে। এত ডাক্তার তো অল্প সময়ে তৈরি করা সম্ভব নয়। সময়ের প্রয়োজন। কিন্তু ততদিন গ্রামের মানুষ কি বিনা চিকিৎসায় মারা যাবে? তা হয় না? শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের প্রাণ কেঁদে উঠলো। তা হতে পারে না। কিছু একটা করতেই হবে। যেমনি ভাবা তেমনি কাজ। তাইতো, সব রোগই তো মারাত্মক রোগ নয়। সব রোগই বড় কঠিন রোগ নয়। ছোটখাটো রোগের জন্য ছোট ডাক্তার। আর বড় রোগের জন্য বড় ডাক্তার। তাহলেই তো সমস্যার অনেকখানি সমাধান হয়ে যায়। গ্রামে গ্রামে ছোট ডাক্তার থাকবে। আর শহরে থাকবে বড় ডাক্তার। তিনি প্রবর্তন করলেন পল্লী চিকিৎসক দল। এরা গ্রামেই বাস করেন। নিজেরাই কেউ দু’ একটা বাংলা বই পড়ে কিছুটা ডাক্তারী বিদ্যা শিখে নিয়েছেন। কেউ জানেন টোটকা। কেউ জানতে চেষ্টা করছেন। কারো আছে শুধু আগ্রহ। তিনি এদের সবাইকে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলেন। মাত্র এক বছরে প্রশিক্ষণ শেষে তৈরি হয়েছিল ২৭০০০ পল্লী চিকিৎসক।
মাত্র পাঁচ বছরে কত কাজ করেছিলেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস রচনার পরিকল্পনা তিনিই নিয়েছিলেন। কবি হাসান হাফিজুর রহমান যখন প্রায় বেকার, হাতে তাঁর কোন কাজ নেই। তখন একদিন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তাঁকে বললেন, স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস রচনার একটি প্রকল্প তৈরি করে দিতে। হাসান সাহেব পাঁচ বছরের একটি প্রকল্প তৈরি করে দিলেন। প্রকল্প পাস হলো। ১৯৭৭ সালের জুলাই মাসে হাসান সাহেব প্রকল্প পরিচালক নিযুক্ত হয়ে কাজ আরম্ভ করলেন। পাঁচ বছরে কাজটি সমাপ্ত হয়েছিল।
কি অসাধরন কর্মবীর ছিলেন তিনি। রাত নেই দিন নেই। সর্বক্ষণ তাঁর মাথায় চিন্তা(দেশের মঙ্গল হবে কি ভাবে! কর্মী-মানুষকে কাজে লাগাতে হবে। সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। করেও ছিলেন।
সেদিন বাংলাদেশের মানুষ প্রচণ্ড উৎসাহে জেগে উঠেছিল। গ্রাম হতে গ্রামে, শহর হতে শহরে তেতুলিয়া হতে টেকনাফ সে কি প্রাণচাঞ্চল্য, সে কি উৎসাহ! সে কি প্রচণ্ড আশা। আর দেশে বন্যা হবে না। দেশে কেউ আর অশিক্ষিত থাকবে না। আট কোটি মানুষের ষোল কোটি হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে যেন ঊর্ধ্বে উঠে বজ্রকণ্ঠে বলছিল, “আমরা আর ভিক্ষা করবো না। পঞ্চান্ন কোটি বর্গ মাইল এলাকার দেশ বাংলাদেশ। বাংলাদেশের সকল মানুষ এক জাতি। বাঙালি, চাকমা, গাড়ো, শাওতাল, খাসিয়া, মুরং কলে মিলে আমরা এক জাতি(বাংলাদেশী জাতি। হিন্দু, মুসলমান, খৃস্টান, বৌদ্ধ সবাই এক জাতি(বাংলাদেশী জাতি। আমরা সবাই মুক্তিযোদ্ধা। যুদ্ধ করে আমরা স্বাধীন হয়েছি। আমাদের মাঝে নেই কোন ভেদাভেদ। আমরা এ দেশকে স্বাবলম্বী করবোই।”
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের প্রতিটি মানুসের মনে জাগিয়ে তুললেন প্রবল আত্মবিশ্বাস। সে জন্য তিনি ঝাঁপিয়ে পড়লেন কাজে। রাত-দিন কাজ আর কাজ। নিঝুম রাত। সবাই গভীর নিদ্রায় মগ্ন। কিন্তু প্রেসিডেন্টের ঘুম নেই। তিনি কাজ করছেন। হঠাৎ মনে এলো একটা সমস্যার কথা। টেলিফোন করবেন কোন একজন সহকর্মীকে। তাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তুললেন, বললেন সমস্যার কথা। এমনি করে তিনি জাগিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন সমগ্র জাতিকে।
কি সহজ-সরল অনাড়ম্বর জীবন যাপন করতেন তিনি! পোশাক-আশাকে তাঁর কোন বিলাসিতা ছিল না। খাবার অভ্যাস ছিল সহজ। এক পদের তরকারি, ভাজি, ডাল, মাছ অথবা মুরগি আর ভাত অথবা রুটি(এ ছিল তাঁর প্রতিদিনের খাদ্য। দেশের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী রাষ্ট্রপতি এমন জীবন যাপন করতে পারেন, এ কথা কেউ বিশ্বাস করবে না। কিন্তু তিনি ছিলেন এমনই। তাঁর আদর্শ ছিল সম্ভবত ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর (রা)। আজকের যুগে এমন রাষ্ট্রপ্রধান হয় না।
তাঁর চিন্তা-ভাবনা ছিল বাংলাদেশের সকল মানুষের জন্য। তিনি যখন শিক্ষা বিষয়ে চিন্তা করেছেন তখন তিনি কি করে সকল মানুষকে শিক্ষিত করা যায় সে কথাই চিন্তা করেছেন। যখন স্বাস্থ্য ও রোগ আরগ্যের কথা ভেবেছেন, তিনি ভেবেছেন বাংলাদেশের সকল মানুষের স্বাস্থ্যের কথা। তিনি কখনোই জাতিকে বা দেশের মানুষকে খণ্ডিত করে, শ্রেণীতে বিভক্ত করে বিবেচনায় আনেননি। সমগ্র বাংলাদেশকে, বাংলাদেশের সকল মানুষকে বিবেচনায় রেখে তিনি দেশের উন্নতির পরিকল্পনা করেছেন।
ইংরেজ আমল হতে আমাদের এ দেশে উন্নয়নের একটি পদ্ধতি নির্মিত হয়েছিল, সে পদ্ধতি ছিল রাজ্য শাসন ও শোষণের পদ্ধতি। ইংরেজের শোষণ ও শাসনে যারা সাহায্য করে তাদের জন্য একটু আরাম আয়েশের ব্যবস্থা করাকেই বলা হতো উন্নয়ন। সে উদ্দেশ্যে তারা যেখানে থাকে সেখানে পথ, ঘাট, বিদ্যুৎ, পানি, স্কুল, কলেজ। বিশ্ববিদ্যালয় ও হাসপাতালের ব্যবস্থা করা হয়, আর তাকেই বলা হলো উন্নয়ন। এতোদিন সেই ধারাই চলে আসছিল। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ইংরেজ প্রবর্তিত এই উন্নয়নকে চিনতে পেরেছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন(এমন পদ্ধতিতে যদি উন্নয়ন পরিকল্পনা করা হয় তা হলে শত শত বছরেও এ দেশের মানুষের পক্ষে কোনদিন উন্নয়ন দেখা সম্ভব হবে না। তাই তিনি যা কিছু করেছিলেন সবই ছিল সকল মানুষের জন্য। সবার জন্য শিক্ষা, সবার জন্য স্বাস্থ্য(এক কথায় সবার জন্য সব কিছু। তিনি সকল মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে চেয়েছিলেন। প্রতিটি মানুসের অন্তরে আশার আলো জ্বালিয়েছিলেন।
বাংলাদেশী জাতির সে কি প্রচণ্ড উচ্চাশা! কি বিশাল সম্ভাবনা! অকস্মাৎ ১৯৮১ সালের ৩০ কালরাত্রিতে জাতির সকল আশা নির্বাচিত হলো। সেনাবাহিনীর জাতির সকল আশা নির্বাপিত হলো। সেনাবাহিনীর কয়েকজন বিপথগামী অফিসারের হাতে তিনি নিহত হলেন। আমাদের সকল আশা, সকল স্বপ্ন ভেঙে খান খান হয়ে গেল।
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
No comments:
Post a Comment